তর্পণ

। গীতশ্রী ভট্টাচার্য্য ।

    চোখ কচলে উঠে বসে কুসুম। মা কই! পাশে নেই তো। ছোট্ট দুটো পায়ে নেমে আসে খাট থেকে। লাল টুকটুকে পা। কাল রাতেই মা আলতা পরিয়ে দিয়েছে। ঘরে তখনও নীল রাতআলো জ্বলছে। দরজাটা খোলা। মা তাহলে বাইরে। সিঁড়ি থেকে ঝপাং করে উঠোনে লাফ দেয় বালিকা। মা চমকে উঠে। 

উঠে পরলি! আরেকটু শুতে পারতি তো। 

তুমি আমায় ডাকলেনা কেন? অভিমানী কুসুম। 

আমি ভেবেছি আমার মা জননী আরেকটু ঘুমোবে, তাই ডাকিনি। একটু পরে ঠিক তুলে দিতাম। 

বাইরে হিম হিম। কেমন যেন আকাশটা। না দিন , না রাত। চাঁদ ও ঝুলে আছে। 

মা, এখন সকাল , না বিকেল? বুঝতে পারেনা কুসুম। 

এটাকে ব্রাহ্ম মুহূর্ত বলে। 

    ঘাসের উপর চাদরের মত বিছানো শিউলি ফুল। সৌরভে আমোদিত। মা ঘর থেকে একটা ছোট গামছা এনে গলা পেঁচিয়ে দেয়। ঠান্ডা লেগে যায় যদি মেয়ের ! ঠাকুরঘরের বড় সাজি এনেছে মা। দুজনে মিলে শিউলি কুড়োয়। কত্ত সাদা সাদা ফুল। সাবধানে ফুল কুড়িয়ে সাজিতে রাখে কুসুম। পায়ে যেন না ঠেকে। 

    বাবা ততক্ষণে রেডিও চালিয়ে দিয়েছে। আজ মহালয়া তো! কে একজন খুব জোরে জোরে মন্ত্র বলেন, গান হয়। কুসুমের মনটা কেমন খুশি খুশি আবার কষ্ট কষ্ট হয়। 

বড় সাজি বারান্দায় রেখে মা ছোট সাজিতে পদ্মফুল তোলে। গোলাপি, সাদা স্থলপদ্ম। 

মা, দেখ, তারারা সব মুছে যাচ্ছে। চাঁদ ও। 

এখন সূয্যি ঠাকুর আসবেন তো, তাই। 

    আকাশ ফর্সা হয় ধীরে ধীরে। মা চা করে। আজ কুসুমও একটু চা পাবে। অন্যদিন মা দেয়না। চা খেয়ে বাবা স্নান করে তৈরি হবে। পুরুত দাদু আসবেন। বাবা তর্পণ করবে পুকুর ঘাটে। কুসুম বসে বসে দেখবে। বাবা কোমর জলে দাঁড়িয়ে কী কী সব করবে আর দাদু মন্ত্র বলবে। 

মা বলে, পিতৃপক্ষ শেষ হয়ে দেবীপক্ষ শুরু হবে এবার। 

ছ বছরের কুসুম অতসব মনে রাখতে পারেনা। তাও, দেখে দেখে বোঝার চেষ্টা করে সবকিছু। 


    কাল মহালয়া। কৌশিকী সমস্ত জোগাড় করে রেখেছে। এখনো গরম খুব। পূজো চলে এল তবু হিম পড়েনি। ফ্ল্যাটের বাইরে একটা শিউলি গাছ। তাতেই ফুল ধরেছে। যেতে আসতে দেখেছে সে। কিন্তু , বৃষ্টি নেই তাই  গাছটিকে যেন সজীব মনে হয়না। কেমন ধূসর! 

    মা বাবা কেউই নেই। কৌশিকী বাবাকে তর্পণ করতে দেখেছে এরকম দিনে। তর্পণ মানে স্মরণ। পূর্বপুরুষদের শ্রদ্ধা জানানো। শুধু পূর্বপুরুষ নয়, যাঁরা পৃথিবী  ছেড়ে চলে গেছেন অন্যলোকে, যাদের কেউ নেই সকলের উদ্দেশেই এই শ্রদ্ধা, এই স্মরণ।কৌশিকী যখন তর্পণ করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিল, পুরুত মশাই চমকে উঠেছিলেন। 

তুমি কী করে তর্পণ করবে! 

একজন মানুষ হিসেবে। 

স্তম্ভিত পুরুত বলেছেন, এ হয়না। তুমি নারী। তোমার কী দাদা, ভাই কেউ নেই? 

আছে , কিন্তু নারী কী মানুষ নয়! নারী কী কোনো গর্ভে জন্ময়ানা! তবে! 

    না, এই প্রশ্নের জবাব সে পায়নি কারো কাছে। তাই নিজেই একান্তে নিজস্ব ভাবে স্মরণ করে সমস্ত পূর্বগামি দের যাঁরা এখনো হয়ত বা সূক্ষ্ম দেহে প্রতীক্ষা করে আছেন ওদের কুসুমের। 


    ব্রহ্মপুত্রের তীরে স্পষ্ট মন্ত্র উচ্চারণে এক নারী তর্পণ করছে। আশেপাশের সকলের দৃষ্টি এদিকে। রমণীর কোনদিকে ভ্রুক্ষেপ মাত্র নেই। সকরুণ মিনতিতে আহ্বান করছে মা , বাবা সহ সমস্ত পূর্বজদের। আহ্বান করছে চেনা, অচেনা সকল ব্যক্তিদের যাঁদের ঠিকানা এখন নক্ষত্রলোক। বৃক্ষ, জীবকুল সকলের জন্যই তার আকুল প্রার্থনা। 

তৃপ্তি হোক, তৃপ্তি হোক সকলের। প্রত্যেক সূক্ষ্ম আত্মা তৃপ্ত হোক। নিজের মনেই ব্যাকুল ভাবে বিড়বিড় করে কুসুম। 

তার আহ্বানে নেমে আসছেন তখন ওপারের বাসিন্দারা।প্রত্যেকের মুখে আনন্দের ছাপ। কেউ দেখতে পায়না ওদের। নারীটি  তিল জল অর্পণ করে নিবিষ্ট মনে। জলের মধ্যে ভেসে যায় ফুল, দূর্বো, তিল। 

অঞ্জলি দেওয়ার সময় একবার সজোরে কেঁপে উঠে তার বুক। কে যেন খুব অস্ফুটে বলে, কুসুম , মা আমার ;জল দে, আরেকটু জল। 

এ যে স্পষ্ট মায়ের গলা। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই সপ্তাহের জনপ্রিয় পোষ্ট

আকর্ষণীয় পোষ্ট

প্রান্তিক জীবন যেখানে রোদ্দুর লিখতে চায়

। চন্দ্রিমা দত্ত । অনলাইন থেকে মুদ্রিত সংস্করণ 'প্রতাপ' প্রথম খণ্ড যেদিন সম্পাদক কবি শৈলেন দাস আমার হাতে এনে দিল খুব আনন্দ হচ্ছিল আম...