অনলাইন থেকে মুদ্রিত সংস্করণ 'প্রতাপ' প্রথম খণ্ড যেদিন সম্পাদক কবি শৈলেন দাস আমার হাতে এনে দিল খুব আনন্দ হচ্ছিল আমার কারণ 'প্রতাপ'-এর জন্মলগ্ন থেকেই আমি এই ছোট পত্রিকাটিকে জানি এবং স্নেহ করি। স্নেহ করি সেই শৈলেনকে যে অল্প বয়স থেকে সাহিত্যকে ভালোবেসে লেখার জগতে আসে এবং একটি ছোট পত্রিকা করার স্বপ্ন দেখেছিল। সেইসাথে স্বপ্ন দেখেছিল একটি সুন্দর, সমঅধিকারে গড়ে ওঠা সুষ্ঠু সমাজের যেখানে মানুষ মানুষকে সম্মান করে। সেই স্বপ্ন দেখার কারণ- তার সেই প্রথম যৌবনের দিনগুলো দেখেছিল প্রান্তিকায়িত মানুষের নানা বঞ্চনা এবং অসাম্য। দেখেছিল উচ্চশ্রেনীর মানুষের আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের প্রতি নিম্ন মানসিকতা। ক্রমে শৈলেন বড় হলো, তার ছোট পত্রিকা- 'প্রতাপ' জন্ম নিলো এবং পরবর্তী পর্যায়ে পরিচিতি গড়ে উঠতে থাকে নতুন আশা-আকাঙ্ক্ষায়। শৈলেনও শিক্ষকতার পেশার সাথে জড়িত হলে জীবন নানাভাবে বিস্তার লাভ করে। চিন্তা-চেতনার শেকড়ও গভীরে প্রোথিত হয়। শৈলেন আজ সামাজিক কাজকর্মে সক্রিয় মানুষ আর সেখানে তাকে সাহায্য করছে তার ছোট পত্রিকা 'প্রতাপ' যা আজ সাহিত্যের এক উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মও বটে নতুন লেখাকর্মীদের কাছে।
এই মুদ্রিত সংস্করণে সম্পাদক শৈলেন দাস লিখেছেন- " আজ আমরা অনলাইন থেকে নির্বাচিত কিছু লেখা নিয়ে এই যে মুদ্রিত সংস্করণ প্রথম খণ্ড প্রকাশের পথে, তা নিছক একটি বই নয়- এটি অনলাইন সৃজনযাত্রার প্রথম মাইল ফলক। একদিকে প্রযুক্তির স্পর্শে বদলে যাওয়া পাঠাভ্যাস, অন্যদিকে কাগজের পৃষ্ঠায় ছাপা লেখার প্রতি মানুষের চিরন্তন ভালোবাসা ... " আসলে যতই অনলাইন লেখাপত্র আমরা পড়ি না কেন ছাপার অক্ষরের প্রতি লেখক, পাঠক সকলেরই এক নিবিড় আগ্রহ এবং ভালোবাসা রয়েছে। তাই এই সংকলনের সিদ্ধান্ত শৈলেনের অবশ্যই এক শুভ উদ্যোগ বলবো
এবার লেখাগুলো একটু ছুঁয়ে দেখা যাক। গল্প, মুক্ত-গদ্য, এবং ভ্রমণ সবই খুব সংক্ষিপ্তভাবে লেখা কারণ বড় লেখার সুযোগ এখানে নেই কিন্তু বিন্দুতেই সিন্ধু দর্শন হয় যদি লেখার মুনশিয়ানা থাকে। আমিও ব্যক্তিগত সময়ের অভাবে সংক্ষিপ্ত ভাবেই অনুভবটুকু লিখছি।
সুজিতা দাসের গল্প- 'একটি কালো মেয়ের গল্প', যেখানে গল্প এগিয়েছে একটি পরিবারের কন্যা যার গায়ের রং কালো তাকে ঘিরে। আর এই কালো রংয়ের জন্যই মেয়েটিকে নানা অবহেলা করা হয় পরিবারে, যেখানে পড়াশুনো করতেও বাঁধা দেন মা। তাঁদের কথা- গায়ের রং যেহেতু কালো লেখাপড়া করে কী হবে? বরং সংসারের যাবতীয় শিখুক, ভবিষ্যতে কাজে আসবে। সমস্ত লাঞ্ছনা, অবহেলা, অবজ্ঞা অতিক্রম করে মেয়েটির মেধা ও বিশ্বাসই এক পরম আলো হয়ে ওঠে। এই পজিটিভ ভাবনা গল্পটির মূল সুর। পড়ে ভালো লেগেছে তবে লেখক গল্প লেখার ক্ষেত্রে আরও খুঁটিনাটি বিষয় ভেবে দেখে আরও একটু যত্নশীল হলে অন্যমাত্রা যোগ হতো গল্পটিতে।
'টুকরো বনের গল্প'- কাত্যায়ণী দত্ত চৌধুরী এই সুন্দর গদ্য লেখাটির মধ্য দিয়ে আমাদের এক উত্তম অভিজ্ঞতা শোনালেন যা বড়ই মনোগ্রাহী। প্রকৃতি মানুষের এক ও অদ্বিতীয় বন্ধু। বন্ধু হিসাবে, মা হিসাবে তাকে যত্ন করলেই মানুষের সার্বিক মঙ্গল। এই কথা বার বার সব মনীষীরাই উচ্চারণ করে গেছেন। আমরা এখানেও আবার শুনলাম। লেখার শিরোনামটি খুব সুন্দর।
'বিশ্বপ্রেম' নিয়ে যোগেন্দ্র চন্দ্র দাস সংক্ষিপ্ত কিন্তু সুন্দর একটি লেখা দিয়েছেন যেখানে স্বার্থহীন উদার মানবিক সম্পর্কের কথা বলেছেন যা আজ এই অস্থির সময়ের দাবী।
রাহুল দাসের 'একটি পবিত্র তীর্থস্থান নুনকুলি' পড়ে যতটুকু জানলাম তা আমার আগে জানা হয়নি। এই লেখাটি পড়ে অনেক পাঠকরাও জানবেন এবং ভ্রমণে আগ্রহী হবেন আমার বিশ্বাস। প্রকৃতির অনেক রহস্য মিথ হয়ে ধর্ম বিশ্বাসে রূপান্তরিত হয়ে মানুষকে সুন্দরে বেঁচে থাকার রসদ জোগায় বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকাতে। প্রান্তিক জনজীবনকে আমাদের মানে অতি আধুনিকদের আর দেখা হয় কোথায়!! আমরা নিজেদের নিয়েই অতিব্যস্ত। পাঠক হিসাবে তাই নুনকুলি নিয়ে আগ্রহ জন্মে।
শিপ্রা দাশের দু'টি গল্প- 'আশা' এবং 'অদ্ভুত হাসি'- প্রথমটি যন্ত্রণার, দ্বিতীয় গল্প কিছুটা রহস্য ঘেরা। ভালোই লেগেছে পড়ে তবে আমার মনে হয়েছে- গল্প দু'টো আর একটু টানটান হতো যদি লেখক কিছু শব্দের ব্যবহারে ঘটনায় একটু চমক আনতেন। আগামীতে নিশ্চয়ই আমরা শিপ্রা দাশের নিটোল গল্প পড়ব।
'মা, যে কথাগুলো তোমায় বলা হয়নি' - পুষ্পিতা দাসের এই আবেগঘন লেখা নিয়ে কিছু বলা মানে বেমানান হবে কারণ এখানে - এই লেখায় জড়িয়ে আছেন - মা নামে এক অনন্ত আলো; আর আছে সন্তানের বেদনা। মাতৃত্ব এক অতুলনীয় ব্যপার। মা সেখানে বটবৃক্ষ হয়ে সন্তানকে জড়িয়ে থাকেন। অল্প বয়সে আমরা অনেক সময় সেই স্নেহের মহিমা বুঝি না তাই ম্যাচিওরিটি এলে বড় আপশোষ হয় এই ভেবে যে- আমাদের কর্তব্য পালনে কত ত্রুটি রয়ে গেলো!!
সীমা ঘোষ 'ভয়' গল্পের ছোটপরিসরেই সাধারণ মানুষের জীবনযুদ্ধ ও সমাজের অব্যবস্থার বিষয়টি সেইসাথে অসম লড়াইয়ে হেরে যাবার ভয়কে তপতীর মধ্য দিয়ে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই ভয়ের কাছে সত্যিই অসহায় আর্থিকভাবে ক্ষমতাহীন মানুষরা।
কবিতা যারা লিখেছেন- রুমা দাস, সুচরিতা দাস, মঙ্গলা দত্ত রিমি, সুস্মিতা দাস চৌধুরী, রঞ্জন কুমার বনিক, পিংকী দাস, অপর্ণা কুমার, গোপেন দাস, আব্দুল হালিম বড়ভূইয়া, সদয় দাস, আকাশ ধর, রিপন দাস, মীনাক্ষী নাথ, প্রমীলা দাস, চয়ন ঘোষ, প্রিয়তোষ শর্মা, পল্লব দে, সুরজ কুমার নাথ ... বেশীরভাগ কবির কবিতায় প্রান্তিকায়িত এই জীবনের বোধ,যাপনচিত্র, বন-বনানী, প্রকৃতি, নদী, বিল, হাওর, সম্পর্কের সৌন্দর্য, বিষন্নতা এবং গভীরতার সাথে ছুঁয়ে আছে কিছুটা আধ্যাত্মচেতনাও। কবিতাগুলো ভালোলাগার রেশ দিলেও মনে হলো কোথাও কী আর একটু কিছু দেবার ছিল কবির? একটু অসম্পূর্ণতা কী রয়ে গেলো? দরকার যা ছিল তা হলো- সৃজন হাতে অক্ষর-ফসলকে আর একটু গুছিয়ে তোলা। আর সেজন্য জরুরী পরিবর্তিত সময়ের দিকে চোখ রাখা, শব্দ-অক্ষরে আরও কিছুটা নিমগ্ন থাকা। লিখতে লিখতে চর্চার মাধ্যমে এই কবিরাই একদিন চমৎকার সব কবিতা লিখবেন এ আমার বিশ্বাস কেন না সময় তাদের অভিজ্ঞ করে তুলবে লেখাকর্মী হিসাবে।
আরও যারা কবিতা লিখেছেন এই সংকলনে- মমতা চক্রবর্তী, স্বাতীলেখা রায়, আদিমা মজুমদার, যোগেন্দ্র চন্দ্র দাস এবং শৈলেন দাস। এখানেও নানা অনুভূতি নিয়ে লেখা কবিতায় মা ও বাবা এসে দাঁড়িয়েছেন, দাঁড়িয়েছে আমাদের অন্তর্গত আমি, ২০২৫শে মৃত্যু এসে যে সঙ্গীত শিল্পীকে মিথ বানিয়ে গেলো, বলা যায় অমরত্ব দিয়ে গেলো সেই শিল্পী জুবিন গর্গও এখানে স্মৃতির ছায়ায়, এসেছে আমাদের শনবিলের জলকথা এবং আরও কতকিছু। কবিতার সাথে পাঠকের কখন বন্ধুত্ব হয়ে যায়, ভেতরটা জলতরঙ্গের মতো বেজে ওঠে পাঠক নিজেও জানেন না। তাই কবিতা চিরকাল লৌকিক, অলৌকিকে যেন এক হলুদ আলোমাখা রহস্যময় বিষন্ন বাড়ি, যার প্রবেশ পথ আমাদের সকলের জানা হয়ে ওঠে না।
সবচেয়ে আমার কাছে ভালোলাগার বিষয় হচ্ছে উৎসর্গ পাতাটি। সেখানে উজ্জ্বল হয়ে আছে কবি ছবি গুপ্তার নাম। সেজন্য সম্পাদক শৈলেন দাসকে আমি ধন্যবাদ জানাই।
আগামীতে আমরা প্রতাপের কাছ থেকে আরও অনেক ভালো লেখাপত্র পাবো সেই আশা রাখলাম। মূল্য- ১২০ টাকা। আগ্রহী পাঠক সংগ্রহ করতে পারেন। প্রতাপ অনলাইন থেকে মুদ্রিত সংস্করণ প্রথম খণ্ড পাঠকপ্রিয়তা লাভ করুক এই শুভেচ্ছা রইল।









































