মাতৃভাষার টান

প্রতাপ : অনলাইন-৪৫

। শেখর মালাকার ।

নদীমাতৃক বাংলার ভোর মানেই কুয়াশা ভেজা ধানক্ষেত, দূরে তালগাছের মাথায় সূর্যের প্রথম আলো, আর মসজিদের আজান কিংবা মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে মিশে থাকা এক মধুর সুর—বাংলা ভাষার সুর। এই ভাষাতেই মা তার সন্তানকে প্রথম আদর করে ডাকে, এই ভাষাতেই কবি স্বপ্ন দেখে, কৃষক গান গায়, আর বিপ্লবী শপথ নেয়।

এই গল্প এক তরুণ বাঙালি—ঋত্বিককে নিয়ে। সে ছিল গ্রামের ছেলে, জন্ম নদীর পাড়ে। ছোটবেলায় তার ঠাকুমা সন্ধ্যাবেলায় তাকে শোনাতেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা, আর বাবা গেয়ে উঠতেন আমার সোনার বাংলা। সেই সুরে ঋত্বিকের হৃদয়ে জন্ম নিয়েছিল এক গভীর টান—ভাষার প্রতি, দেশের প্রতি।

কিন্তু বড় হতে হতে সে শহরে এলো। বড় বড় দালান, বিদেশি বিজ্ঞাপন, ভিন্ন ভাষার চাকচিক্য—সবকিছু তাকে যেন ধীরে ধীরে বদলে দিতে লাগল। সে ভাবতে লাগল, নিজের ভাষায় কথা বললে হয়তো পিছিয়ে পড়তে হবে। বন্ধুরা তাকে বলত—

“বাংলা তো শুধু বাড়ির ভাষা, বড় হতে হলে অন্য ভাষাই ভরসা।”

ঋত্বিক চুপ করে থাকত। কিন্তু তার ভেতরে কোথাও যেন একটা শূন্যতা তৈরি হচ্ছিল।

একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠান হলো। মঞ্চে এক প্রবীণ অধ্যাপক বললেন—

“এই ভাষার জন্য বাঙালি রক্ত দিয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তরুণরা প্রাণ দিয়েছিল, শুধু যাতে আমরা মাথা উঁচু করে ‘বাংলা’ বলতে পারি।”

ঋত্বিকের বুক কেঁপে উঠল। তার মনে পড়ল ইতিহাসের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোর কথা—ঢাকার রাজপথে তরুণদের প্রতিবাদ, শহীদের রক্তে রাঙা ফেব্রুয়ারির মাটি। সে মনে মনে উচ্চারণ করল— আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি।

সেদিনের অনুষ্ঠান শেষে সে লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়তে শুরু করল বাঙালির ইতিহাস। সে পড়ল কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতা, পড়ল ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, জানল কীভাবে বাংলা শুধু একটি ভাষা নয়—এটি এক জাতির আত্মপরিচয়।

ঋত্বিক বুঝতে পারল—ভাষা হারালে জাতি হারায়, শিকড় কেটে গেলে গাছ টিকে না। সে সিদ্ধান্ত নিল, সে নিজের ভাষাকে লজ্জা নয়, গর্ব হিসেবে বহন করবে।

সে সামাজিক মাধ্যমে বাংলা ভাষায় লেখা শুরু করল। বন্ধুদের সঙ্গে সচেতনভাবে বাংলায় কথা বলতে লাগল। কলেজে “বাংলা সাহিত্য চক্র” গঠন করল। গ্রামের স্কুলে গিয়ে ছোটদের বলল—

“তোমরা ইংরেজি শিখবে, অন্য ভাষাও শিখবে, কিন্তু নিজের ভাষাকে কখনও ভুলবে না। কারণ এটাই তোমার পরিচয়।”

ধীরে ধীরে তার উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ল। শহরের তরুণেরা বুঝতে শুরু করল—আধুনিক হওয়া মানে নিজের শিকড় ভুলে যাওয়া নয়। বরং নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধারণ করেই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়ানোই সত্যিকারের গর্ব।

একদিন একুশে ফেব্রুয়ারির সকালে ঋত্বিক শহীদ মিনারের পাদদেশে দাঁড়াল। ফুল হাতে সে মনে মনে বলল—

“এই ভাষায় আমি মাকে ডাকি, এই ভাষায় আমি স্বপ্ন দেখি, এই ভাষায় আমি দেশকে ভালোবাসি। বাংলা আমার অহংকার, বাংলা আমার শক্তি।”

সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। চারদিকে মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছিল—

“আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।”

ঋত্বিকের চোখে জল এল, কিন্তু তা ছিল দুর্বলতার নয়—গর্বের। সে অনুভব করল, দেশপ্রেম মানে শুধু পতাকা ওড়ানো নয়; দেশপ্রেম মানে নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে হৃদয়ে ধারণ করা।

বাংলা ভাষা বাঙালির প্রাণ। এই ভাষায় রয়েছে প্রেম, বিদ্রোহ, সংগ্রাম আর অসীম সম্ভাবনা। যে বাঙালি তার মাতৃভাষাকে ভালোবাসে, সে কখনও মাথা নত করে না।

শেষ কথা :

মাতৃভাষা আমাদের শিকড়, আর দেশ আমাদের আত্মা। শিকড় যত গভীর হবে, আত্মা তত শক্তিশালী হবে। বাঙালি জাতি তার ভাষার মতোই অমর—প্রেমে, সংগ্রামে, গর্বে চিরজাগ্রত।

গল্পের নীতিকথা :

১. মাতৃভাষা জাতির আত্মপরিচয়।

নিজের ভাষাকে অবহেলা করলে মানুষ নিজের শিকড় থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

২. আধুনিকতা মানে শিকড় ভুলে যাওয়া নয়।

অন্যান্য ভাষা শেখা দরকার, কিন্তু নিজের ভাষাকে লজ্জা নয়—গর্ব হিসেবে ধারণ করতে হবে।

৩. ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি ইতিহাস ও আত্মত্যাগের স্মৃতি।

ভাষা আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে—ভাষার জন্য সংগ্রাম মানে অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম।

৪. দেশপ্রেমের অন্যতম প্রকাশ মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা।

যে নিজের ভাষাকে ভালোবাসে, সে নিজের দেশ ও সংস্কৃতিকেও সম্মান করে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই সপ্তাহের জনপ্রিয় পোষ্ট

আকর্ষণীয় পোষ্ট

প্রান্তিক জীবন যেখানে রোদ্দুর লিখতে চায়

। চন্দ্রিমা দত্ত । অনলাইন থেকে মুদ্রিত সংস্করণ 'প্রতাপ' প্রথম খণ্ড যেদিন সম্পাদক কবি শৈলেন দাস আমার হাতে এনে দিল খুব আনন্দ হচ্ছিল আম...