। মেঘমালা দে মহন্ত ।
প্রতাপ’-এর উনিশতম মুদ্রিত সংখ্যা শুধু একটি সাহিত্যপত্রিকার নতুন প্রকাশ নয়, বরং বরাকের সাহিত্য-সংস্কৃতি, ভাষাচেতনা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক আন্তরিক বহিঃপ্রকাশ। “সমাজ ও সাহিত্যের প্রতিভাস” এই পরিচয়ের যথার্থতা সংখ্যাটির সম্পাদকীয়, বিষয় নির্বাচন এবং লেখকদের বহুমাত্রিক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।এই সংখ্যার সম্পাদকীয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বৈশাখের নবজাগরণ, পঁচিশে বৈশাখের সৃজনপ্রেরণা এবং উনিশে মে ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ—এই তিনটি আবেগকে একসূত্রে গেঁথে সম্পাদক যে ভাবনার পরিসর তৈরি করেছেন, তা শুধু আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছাবার্তা হয়ে থাকেনি; বরং এক ধরনের সাংস্কৃতিক অবস্থানও প্রকাশ করেছে। সম্পাদকীয়ের ভাষা সহজ, আন্তরিক এবং.আবেগময়।
অনেক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে শৈলেন দাসের প্রতাপের পথচলা মূলত একজন সাহিত্যকর্মীর আত্মসংগ্রামের দলিল, বরাকের প্রান্তিক সাহিত্যচর্চার ভেতরের বাস্তবতা, অবহেলা, সংকট ও আত্মমর্যাদার লড়াইয়ের এক আন্তরিক আত্মকথন। সম্পাদক অকপ্ট স্বীকারোক্তিমূলক ভঙ্গিতে সেই পথচলার কথা বলেছেন। লেখক কোথাও নিজেকে নিখুঁত প্রমাণ করার চেষ্টা করেননি; বরং নিজের সীমাবদ্ধতা, আর্থিক দুর্বলতা, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং মানসিক আঘাতগুলোও খোলাখুলিভাবে তুলে ধরেছেন। ফলে লেখাটি পাঠকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, “সম্পাদক পরিচয়ের আড়ালে লেখকসত্তার অস্বীকৃতি” প্রসঙ্গটি অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে এসেছে। সাহিত্যজগতের অন্তর্গত নীরব প্রতিযোগিতা, স্বার্থ, গোষ্ঠীবাদ এবং সামাজিক স্বীকৃতির রাজনীতিকে লেখক সরাসরি আক্রমণ না করেও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছেন।
লেখাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এখানে “প্রতাপ” কেবল একটি সাহিত্যপত্রিকা নয়, বরং একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রয়াস হিসেবে উঠে এসেছে। বিশেষ করে কৈবর্ত সমাজের নতুন প্রজন্মকে সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত করার যে লক্ষ্য, তা লেখাটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। প্রান্তিক সমাজের তরুণদের লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত করার এই প্রয়াস নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং বরাকের সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিসরে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে লেখাটির কিছু জায়গায় ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও অভিমান দীর্ঘ হয়ে গেছে বলে মনে হতে পারে। কয়েকটি অনুচ্ছেদে একই ধরনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি আছে, যা কিছুটা সংযত হলে লেখার গতি আরও দৃঢ় হতে পারত। তবু সেই আবেগকে পুরোপুরি দুর্বলতা বলা যায় না, কারণ সেটিই লেখাটিকে জীবন্ত ও মানবিক করেছে।
অনলাইন সংস্করণ চালুর প্রসঙ্গ এবং লেখকদের জন্য নির্দিষ্ট শর্ত আরোপের বিষয়টি সময়োপযোগী। এখানে সম্পাদক হিসেবে শৈলেন দাসের বাস্তববাদী মানসিকতা ফুটে উঠেছে। তিনি বুঝেছেন, বর্তমান সময়ে সাহিত্যচর্চা শুধু ছাপার পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; প্রচার, পাঠকসংযোগ এবং ডিজিটাল উপস্থিতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে বলা যায়, এই লেখাটি একজন মানুষের হার না মানা মানসিকতার দলিল। প্রতিবন্ধকতার বর্ণনার মধ্যেও লেখক হতাশায় ডুবে যাননি; বরং আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ প্রত্যয়ের জায়গা ধরে রেখেছেন। তাই “প্রতাপের পথচলা” শুধু একটি পত্রিকার গল্প নয়, বরং বরাকের বিকল্প সাহিত্যচর্চার এক সংগ্রামী ইতিহাসের আখ্যান।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন