কবরস্থানের রহস্য

প্রতাপ : অনলাইন-৪২

।  প্রতীক চক্রবর্তী ।

গৌরবপুর থেকে কিছু দূরে অবস্থিত ছিল একটি বড় কবরস্থান। এটি প্রায় দুশো বছর পুরোনো। না জানি কী যে রহস্য লুকিয়ে আছে সেই কবরস্থানে, যা আজও লোকেদের প্রাণ নিয়ে খেলা করে। কবরস্থানটির জমির আকৃতি ছিল বর্গাকৃতির। আশেপাশে ছিল বড় বড় তালগাছ। রাস্তাটিও ছিল আঁকাবাঁকা। আশেপাশে কোনো ঘরবাড়ি নেই, শুধু ছিল গাছগাছালির মধ্যে দু-চারটি বাঁশ-বেতের ঘর।

রাস্তাটি দেখে মনে হচ্ছিল যেন অনেক দিন ধরে কেউ যাতায়াত করেনি। রাস্তার চারপাশে ছিল শুকনো গাছের পাতা। রাস্তাটির বাঁদিকে ছিল একটি বড় বটগাছ। এর কিছু দূরে অবস্থিত ছিল বিশ্বম্ভর বাবুর ঘর। উনি প্রায় রাত্রে দশটা পর্যন্ত জেগে থাকতেন। এবারও একই অবস্থা—উনি আজও দশটা পর্যন্ত জেগে আছেন। ডায়েরিতে আজকের দিনের সব ঘটনা লিখছিলেন।

ওনার ছোটোবেলা থেকেই এই শখ ছিল। ছোটোবেলায় উনি ওনার শিশু আনন্দ উপভোগ করে সন্ধ্যাবেলা সেই দিনের স্মৃতিটিকে ডায়েরিতে বন্দী করে রাখতেন। এটি ওনার ছোটোবেলার শখ ছিল, যখন উনি আট বছরের ছিলেন। এবার বৃদ্ধ হয়ে এসেও সেই একই শখ নিয়ে আছেন। বর্তমানে উনি ঘরে একাই থাকতেন। গত বছর একটি পথ দুর্ঘটনায় ওনার পুরো পরিবার মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছিল। ঈশ্বরের কৃপায় উনি বেঁচে যান। তারপর থেকে উনি একাই সব করছেন।

ওনার ঘরের বাইরে একজন পাহারাদার ছিল। সে পুরো ঘর রাত্রিবেলায় পাহারা দিত। আজকে আসতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বম্ভর বাবু তখন ডায়েরি ওনার বিছানার কোণায় রেখে রান্নাঘরে জল খেতে গেলেন। এমন সময় বাইরে থেকে উচ্চ কণ্ঠে কারও চিৎকারের শব্দ শোনা গেল। শব্দটি শুনে উনি একটি টর্চ নিয়ে বাইরে বেরোলেন।

গেটের সামনে গিয়েই উনি অবাক! চারদিক রক্তে মাখামাখি এবং ওনার পাহারাদার মৃত অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে। উনি দেখলেন, দেহটির পাশ দিয়ে একটি রক্তাক্ত পায়ের ছাপ কবরস্থানের দিকে যাচ্ছে। উনি ভাবলেন, হয়তো কেউ খুন করে কবরস্থানের দিকে পালিয়েছে। উনি তখন হাতে একটি কাঠের দণ্ড নিয়ে কবরস্থানের দিকে গেলেন।

কবরস্থানের ভিতরে প্রবেশ করার পর একটি ঠান্ডা বাতাস ওনার শরীর দিয়ে বয়ে গেল। ঠান্ডা বাতাসটি অনুভব করে উনি চমকে উঠলেন। উনি তখন ধীরে ধীরে একটু এগিয়ে গেলেন। কিছু দূর এগিয়েই উনি দেখলেন, একটি কবরের সামনে কে যেন বসে আছে। তার পুরো দেহ রক্তে মাখামাখি। এমন লাগছিল যেন কোনো মৃত লোক কবর থেকে উঠে এসেছে। শরীর থেকে কেমন যেন একটা গন্ধ আসছিল।

উনি তখন একটু সাহস জুগিয়ে কোনোমতে বলে উঠলেন,

“কে তুমি?”

প্রশ্নটির কোনো উত্তর এল না। উনি আরেকবার বললেন, কিন্তু এবারও কোনো উত্তর এল না। বিশ্বম্ভর বাবু এবার আরেকটু এগিয়ে গেলেন। তারপর টর্চটি লোকটির মুখে মারলেন। লোকটির মুখ দেখেই উনি ভয় পেয়ে গেলেন। চেহারা ছিল বিকৃত, চোখ দুটি বড্ড ছোটো, মুখে রক্ত লেপিত এবং পুরো দেহের চামড়া নেই—শুধু দেহের মাংসই দেখা যাচ্ছিল। একটু বিকৃতভাবে হেসে সেই অদ্ভুত লোকটি কবরের পাশ থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর ধীরে ধীরে ওনার দিকে আসতে লাগল।

উনি তখন “রাম, রাম, রাম, রাম…” বলতে বলতে নিজের বাড়ির দিকে দৌড়োলেন। শরীর থেকে ভয়ের এক অদ্ভুত ঘাম ঝরছিল। দৌড়তে দৌড়তে উনি ওনার বাড়ির ঠিক গেটের সামনে এসে পৌঁছলেন। এমন সময় কে যেন ওনার পিঠে হাত রাখল। চমকে উঠে পিছনে ফিরে দেখলেন—ওনার বাড়ির পাহারাদার ওনার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

উনি তখন এসব দেখে হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে বললেন,

“তুমি তো মরে গিয়েছিলে! তাহলে তুমি এখানে? আর ওই লোকটি?”

ওনার কথা শুনে পাহারাদার বলল,

“এ আপনি কী বলছেন, সাহেব! আমার ছেলে একটু অসুস্থ ছিল বলে দোকানে গিয়েছিলাম ওষুধ কিনতে, তাই দেরি হয়ে গেছে।”

পাহারাদারের কথা শুনে বিশ্বম্ভর বাবু নিচে চেয়ে দেখলেন—সেখানে কোনো লাশ নেই এবং রক্তের একটুও চিহ্ন পর্যন্ত নেই।

এই ঘটনার পর থেকে সেই কবরস্থানটিকে লোকেরা ভয় করতে শুরু করে। আজও সেই কবরস্থানের ভিতরে অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে, যা লোকেদের কাছে ভয়ের ভাণ্ডার। পণ্ডিতের সাহায্যে কবরস্থানটির উপর মন্ত্র পড়ে সেটিকে সারাজীবনের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সেই কবরস্থানটির বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর রহস্যগুলোও সারাজীবনের জন্য সেখানে বন্ধ হয়ে যায়। এখন কেউ এই কবরস্থানের পথে দিয়ে আসা-যাওয়া করে না। এটি আজও লোকেদের সেই ভয় মনে করিয়ে দেয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই সপ্তাহের জনপ্রিয় পোষ্ট

আকর্ষণীয় পোষ্ট

প্রান্তিক জীবন যেখানে রোদ্দুর লিখতে চায়

। চন্দ্রিমা দত্ত । অনলাইন থেকে মুদ্রিত সংস্করণ 'প্রতাপ' প্রথম খণ্ড যেদিন সম্পাদক কবি শৈলেন দাস আমার হাতে এনে দিল খুব আনন্দ হচ্ছিল আম...