অচেনা অনুভূতি

প্রতাপ : অনলাইন-৪৩

। পুষ্পিতা দাস ।

ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে বাসস্ট্যান্ডের দিকে হেঁটে চলেছে তিতাস আর তন্ময় সাড়ে তিনটের বাস ধরবে বলে। আজ ওদের সঙ্গে আর কেউ নেই। ক্যাম্পাস ইন্টারভিউর পরই তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে আসছিল তিতাস। আজ তাঁর অন্য কোনো দিকে নজর নেই। নিজের দিকেও না। আজ সে নিজের মধ্যেই নেই যে। বাকি দিনগুলিতে সে নিজে ডেকে ডেকে সবাইকে নিয়ে তবেই বাস ধরতে যায়। কিন্তু আজ তাকে এভাবে বেরিয়ে আসতে দেখে তন্ময় ও তার সঙ্গে চলে আসলো। সে বুঝতে পারছিল তিতাসের কিচ্ছু একটা হয়েছে। সে জিজ্ঞেস করেই চলেছে, "কী রে তিতাস কি হয়েছে তোর? কিছুদিন থেকেই আমি লক্ষ্য করছি তুই সব সময় কেমন একটা অন্যমনস্ক হয়ে থাকিস। কিচ্ছু বললে ভালো করে শুনিস না। কী হয়েছে বলবি?" কিন্ত তন্ময়ের কথা কে শুনবে আজ! তিতাস তো তার নিজের মনের সঙ্গে কথা বলে চলেছে। কত প্রশ্ন তাঁর মনে ঝড় তুলছে। যাদের উত্তর তার জানা নেই। কতবার সে ভেবেছে আর কেউ না হোক, তন্ময়কে তো বলতেই পারে তার মনের কথা। কিন্তু এই কথাটি সে তন্ময়কেও বলতে পারলো না।

    তিতাস ও তন্ময় সে-ই উচ্চমাধ্যমিক থেকে একই কলেজে পড়াশোনা করছে। চার পাঁচজন ছেলেমেয়েকে নিয়ে তিতাসদের গ্রুপ, যারা সব সময় একসাথে থাকে। তার মধ্যে তিতাস আর তন্ময় বলা যায় বেস্ট ফ্রেন্ড। ওদের এই ফ্রেন্ডশিপ নিজের অজান্তেই বিশেষ দিকে মোড় নিয়েছিল। দুজন হয়তো দুজনের মধ্যে নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখেছিল। ওরা কেউ কাউকে কোনোদিনই কিছু মুখ খুলে বলেনি ঠিকই, কিন্তু ওদেরকে নিয়ে সবাই এমনটাই ভাবতো। ওদের গ্রুপের প্রত্যেকেই পড়াশুনায় দারুণ ভালো। সব সময়ই পড়াশুনা নিয়ে ডিসকাশন। তাই অন্য কিছু নিয়ে ভাবার সময় কই? তার ফাঁকেও তিতাসের সব কথা যেমন তন্ময়কে বলতে হবে তেমনি তন্ময়ও কোনো কথা তিতাসকে না বলে পারে না। এমনি করে খুব তো ভালো-ই কাটছিলো ওদের দিনগুলো। কলেজ শেষ করে ইউনিভার্সিটি, আর এখন তো ইউনিভার্সিটির দিনও শেষ হয়ে এলো। বিদ্যা বুদ্ধি মেধা মানসিকতা সৌন্দর্য্য কোনো কিছুর দিক দিয়েই তিতাস তন্ময়ের জুটির কোনো জুড়ি নেই। কিন্তু হঠাৎ করে কেনো হলো এমন ছন্দপতন! যার ভার শুধু তিতাসকেই বইতে হচ্ছে! আর কেউই তো তিতাসের মনের খবর জানে না। আর জানলেই বা কী হয়ে যাবে। সে নিজেই তো ভালো করে বুঝতে পারছে না 'নীল'কে নিয়ে আজকাল সে কেনো এতো ভাবছে। কী আছে ঐ নীলের মধ্যে? দেখতে তো ওই আর পাঁচটা ছেলেমানুষের মতই। পড়াশোনায়, কথাবার্তায় সে ভালো কিন্তু অন্যদের থেকে তফাৎটা কোথায়? তিতাস সব সময়ই সবার সাথেই খোলা মন নিয়েই চলেছে, কত ভালো ছেলেরাই তো তাকে নিজের করে পেতে চেয়েছিল কিন্তু ওইভাবে তো কেউ তার ভাবনায় আসেনি কোনোদিন! তবে নীল কেনো আসছে? 

   ফোর্থ সেমিস্টার চলছিল তিতাসদের। ক্লাসের ফাঁকে ক্যান্টিনে বসে রোজকারর মতই একটু আড্ডা চলছিল ওদের। ঠিক তখনই দুর থেকে তিতাসের নজর পড়ল একজনের দিকে। না চাইতেও সে তার থেকে চোখ ফেরাতে পারছিল না। তিতাসেরও মনে হচ্ছিল ছেলেটিও যেন তার দিকে একটু বেশী করেই দেখছে। ওদেরকে ক্রস করে চলেই যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ টার্ন করলো আর এসে তন্ময়কেই বলল, তুমি কী তন্ময়, ঋষভের কাজিন? আমি নীল, ঋষভ আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। 'ও হাই! হ্যাঁ ঋষভের কাছে তোমার নাম শুনেছি।" বলল তন্ময়। তারপর থেকে প্রায়ই আসে নীল, তন্ময়দের সাথে দেখা করতে। কখনও লাইব্রেরীতে কখনও ক্যাফেতে। সেও যেন ধীরে ধীরে ওদের গ্রুপের একজন হয়ে উঠল। কিন্তু তিতাস খেয়াল করছিল সে যেন রোজই নীলের জন্য অপেক্ষা করে থাকতো, কখন সে আসবে। আর কোনোদিন না আসলে তার মন খারাপ লাগতো। সে বুঝে উঠতে পারছিল না কেনো এমন হচ্ছে? ভেবেছিল এমনি করেই ব্যাপারটা মন থেকে চলে যাবে। পড়াশুনার চাপ, ইউনিভার্সিটি, ঘর এসব করে করে দিনগুলো কাটতে লাগলো। কিন্তু রোজ নীলের সঙ্গে তাদের দেখা হতই। নীলও যেন একদিনের জন্যও ওদেরকে মিস করতে চাইতো না। নীলের তো নিজের ফ্রেণ্ড সার্কেল ছিলো, ওর ডিপার্টমেন্টও আলাদা, তবে কেনো সে রোজ তন্ময়দের সাথে দেখা করতে চলে আসে! সেও কী একই ভাবে তিতাসের জন্য অনুভব করে? 

  তিতাস তন্ময় বাসস্ট্যান্ডে প্রায় পৌঁছবে, ঠিক তখনই তন্ময় শুনতে পেলো কেউ পেছন থেকে ডাকছে - "তিতা-স,  তিতা-স,...."  কিন্তু তিতাস যেন কিছুই শুনতে পাচ্ছে না।সে শুধু হাঁটছে আর হাঁটছে। আজ হয়তো বাস এসে তাঁর সামনে দাঁড়ালে বাসকে সে দেখতেই পাবে না। তিতাসকে হাত ধরে থামালো তন্ময়, "দাঁড়া তিতাস, নীল আসছে দেখ, কেমন দৌড়ে আসছে আমাদের সাথে দেখা করবে বলে! আর তুই আজ এটা কী করলি, কারো সাথে দেখা না করেই চলে আসতে হলো আজ।"  তিতাস স্তব্ধ। তাঁর মনের ঝড় এক বিন্দুও কমেনি। 

   "কেমন ছিল ইন্টারভিউ তিতাস তোমাদের?" 

 " ভালো ই ", এতক্ষণে কিচ্ছু বলল তিতাস ।

  "কী হয়েছে তন্ময় তিতাসের?"                  

    "সেটা তুমিই জিজ্ঞেস করো এবার। আমি তো এতক্ষণ থেকে জিজ্ঞেস করে কোনো উত্তর পেলাম না।" 

 তিতাসের মনের ভেতরে দলা পাকিয়ে রয়েছে না বলতে পারা কিছু কষ্ট, কিছু প্রশ্ন, যে প্রশ্নগুলোর উত্তর নীলের সাথে পরিচয়ের আগে তার মনে কখনও জাগেনি। 

 তিতাস তন্ময় নীল আবার হেঁটে চলেছে। অজানার উদ্দেশ্যে? তিতাসের সঙ্গে তার খুব প্রিয় দুটি মানুষ, কিন্তু সে আজ বড্ড একা।

1 টি মন্তব্য:

এই সপ্তাহের জনপ্রিয় পোষ্ট

আকর্ষণীয় পোষ্ট

প্রান্তিক জীবন যেখানে রোদ্দুর লিখতে চায়

। চন্দ্রিমা দত্ত । অনলাইন থেকে মুদ্রিত সংস্করণ 'প্রতাপ' প্রথম খণ্ড যেদিন সম্পাদক কবি শৈলেন দাস আমার হাতে এনে দিল খুব আনন্দ হচ্ছিল আম...