। পুষ্পিতা দাস ।
ছোটবেলা যখন আমার জ্বর হতো মা, আর তুমি আমার পাশে বসে কপালে জলপট্টি দিতে, তখন মনে হতো তুমি পাশে না থাকলে হয়তো জ্বরটাকে আর সারিয়েই উঠতে পারব না। ভাবতাম, তুমি না থাকলে কী যে হতো! তখন জ্বরটাই কত বড় ব্যাপার ছিল, আর তোমার উপস্থিতি আমার সব অসহায়তার উপশম। আর আজ দেখো মা—জ্বর তো নয়, একের পর এক ঝড় আমার জীবনের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে। আর তোমার আত্মজা অশ্বত্থ বৃক্ষের মতো অটল। সেসব কত ঝড়ের সাক্ষী তো তুমি নিজেই ছিলে মা। পাছে তুমি ভেঙে না পড়ো, এই ভেবে আমার কষ্ট হচ্ছে—তা আমি কখনোই তোমার কাছে প্রকাশ করিনি। কিন্তু তুমি তো মা, আমার কষ্টগুলো আমার চেয়ে তোমাকেই বেশি কাঁদাত, যদিও তুমিও তা প্রকাশ করোনি কখনও।
যে আমি জ্বর হলে তোমাকে ছাড়া ভাবতে পারতাম না—সে কখন যে এত বড় হয়ে উঠলাম, সে তা নিজেও বুঝে উঠতে পারেনি। আশীষ তখন প্রচণ্ড অসুস্থ, ওকে বাঁচাতে হবে, তাঁর জন্য লিভার ডোনেট করব—এটা আমার কাছে কোনো ব্যাপারই না। এইটুকু করলে একটা প্রাণ বেঁচে যাবে, আশীষ বেঁচে যাবে, তার থেকে বড় আর কী হতে পারে! কিন্তু যত বড়ই হই না কেন মা, আমি লিভার ডোনেট করতে চলেছি, তোমাকে কথাটা বলব—এই সাহস আমি করতে পারিনি, পাছে তুমি তা সহ্য করতে না পারো। আশীষকে নিয়ে যখন আমি দিল্লি হাসপাতালে, তখন জানো মা—কত ডাক্তার আর নার্স আমাকে বলেছে (formal audio-video recordings-এর আড়ালে)— "তুমি কেন এমনটা করছো? তোমার একটা মেয়ে আছে, তা-ও এত ছোটো, তোমার কিছু হলে ওর কি হবে!"
বিশ্বাস করো মা, ওরা যেন আমার নিজের মানুষ, ঠিক এভাবেই আমাকে কথাগুলো বলত! আমি আশীষকেও কথাগুলো বলিনি। তবে কারো কোনো কথাই আমাকে আমার জায়গা থেকে এক চুলও নড়াতে পারেনি। অথচ আমার অপারেশনের আগের দিন অবধি তোমাকে আর বাবাকে এই কথাটি আমি জানতে দিইনি। আজ ভাবি মা, যদি কিছু হয়ে যেত—তোমাকে, বাবাকে, হিয়াকে আমি কী জবাব দিতাম! আমি তো মরেও শান্তি পেতাম না মা! আর সব শেষ হয়ে যাবার পর তোমরা যখন জানতে পেরেছিলে তোমার আর বাবার অজান্তে এত কিছু হয়ে গেল—একটিবারের মতোও অভিযোগ করোনি মা তোমরা! এই আমার ‘মা’ আর ‘বাবা’।
আশীষ চলে গেল, আর তার ঠিক এক-দেড় মাস পর পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে তুমি বিছানায় পড়ে গেলে। তোমাকে আর বাবাকে একটু সুখ দেবো—আমার এই শেষ স্বপ্নটাও ভেঙে চুরমার হয়ে গেল মা। ছোটবেলা থেকে তোমাকে দেখেছি, কিভাবে নিজের কথা কখনও না ভেবে সবার স্বার্থে নিজেকে শুধু উজাড় করে দিয়েছো। রাজ্য সরকারের এক দায়িত্বপূর্ণ অফিসারের পদে চাকরি করেও কত সাবলীল ছিল তোমার চলন-বলন। চাকরি করে ঘরে ফিরেও কিভাবে সবার সব ইচ্ছে তুমি নির্দ্বিধায় মিটিয়ে চলতে, কিভাবে ঠাকুমা আর বাবুপিসীর (specially abled) সেবাযত্ন করেছো। দিনের পর দিন তাঁদের মল-মূত্র নিজ হাতে পরিষ্কার করেছো। অথচ তোমার চোখে-মুখে কোনওদিন কোনো অভিযোগ দেখিনি। শুনিনি। অবাক হয়ে দেখতাম তোমাকে! আজও অবাক হয়ে ভাবি তোমার কথাই।
এখনও আমার মনে আছে মা — একবার ঠাকুমাকে আমাদের ঘর থেকে উনার বড় মেয়ে (আমার বড়পিসি) উনার বাড়িতে নিয়ে এক মাসের জন্য বেড়াতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। সে কী কান্না ঠাকুমার! তুমি বুঝতে পেরেছিলে, আর উনাকে সামলে নিয়ে বলেছিলে— "মা, আমি আপনাকে কোথাও যেতে দেব না।” বেড়াতে যেতে হলো না ঠাকুমাকে। ঠাকুমা বলতেন—"আমার কেউ নেই। প্রমোদ রায় (আমার দাদু) একটা মেয়ে জন্ম দিয়ে রেখে গিয়েছিল আমার জন্যে।"
আর সেই ‘তুমি’ বিছানায় কষ্ট পাচ্ছিলে—সবরকম সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করেও আমি বুঝতে পারছিলাম মা, তোমার মনের সুখ ফিরিয়ে দিতে আমি অপারগ। যে মানুষটা সারাজীবন শুধু সবার জন্য করেই গেছে, নিজের কথা এক মুহূর্তের জন্য ভাবেনি, সেই মানুষটি আজ বিছানা থেকে উঠতে পারছে না। তাঁকে আমি কী সুখ দেব! অথচ তুমি বিছানায় শুয়ে আমাকে বলতে— "তোমাকে একটু ভাত বেড়ে দেবে এমন তো কেউ নেই—তাই না!" আর আমি তোমাকে বলতাম— "এসব নিয়ে তুমি একটুও ভেবো না মা। এসব আমার চাই না, আমার শুধু একটাই চাওয়া—তুমি খুশি থাকবে।”
কিন্তু পারলাম কই! তোমাকে এ অবস্থায় দেখে সহ্য হতো না আমার। কখনও চিৎকার করে বলেছি তোমাকে— কেন একটু নিজের কথা ভাবলে না মা! কেন নিজের একটু যত্ন নিলে না! কী পেলে বিনিময়ে তুমি! আসলে তোমার মতো নিঃস্বার্থ মানুষেরা হয়তো নিজেকে উজাড় করে দিতেই এই পৃথিবীতে আসে।
এমন একটা দিন আসবে আমার জীবনে—যেদিন তুমি থাকবে না, আর আমি থাকব এই পৃথিবীতে—এটা আমার ভাবনারও অতীত ছিল। অথচ তুমি যেদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলে, সেদিন থেকে আজ অবধি ভালো করে কাঁদতেই পারলাম না তোমার জন্য। হয়তো সেই না-ঝরে যাওয়া অশ্রুবারিটুকুই শক্তি হয়ে আজও আমায় চালিত করছে মা। কারণ তুমি তো জানবে মা—যে, আমার দায়িত্ব আজ অবধি একটুও কমে যায়নি। আমার তোমাকে নিয়ে একটাই দুঃখ থেকে গেল মা—তোমাকে সুখ দিতে পারলাম না।
মানুষ চলে যায়, আমিও চলে যাব একদিন। কেউ কাউকে মনে রাখে না দীর্ঘদিন। তুমিও একদিন এই পৃথিবী থেকে পুরোপুরি মুছে যাবে। কিন্তু কী জানো মা—"তোমার চেয়ে ভালো কিছু আমার দু-চোখ কখনও দেখেনি।" আমার মধ্যে সামান্য ভালো যদি কিছু থেকে থাকে, তার সবটুকুই তোমার থেকে পাওয়া। আর আমার এই অস্তিত্বেই তুমি বেঁচে আছো, থাকবে।
সবশেষে এইটুকুই বলব মা— "মৃন্ময়ী দশভূজা আমরা সবাই দেখি; আমি তোমাতে দেখেছি চিন্ময়ী দশভূজা।"
[বি.দ্র.: এটি কোনো গল্প নয়, আমার মনের কিছু কথা আমার মা-কে নিয়ে। সুপ্রিয় পাঠকেরা এই কথাগুলোর মধ্যে নিজেদের মায়েদেরও খুঁজে পাবেন বলে আমার বিশ্বাস।]


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন