চেনা সুর

প্রতাপ : অনলাইন-৪৪

। বিশ্বরাজ ভট্টাচার্য ।

ফের সেই সুর। রাগ ভৈরব।

ভাঙা ভাঙা কিন্তু মিষ্টি গলা! বয়সের ছাপ আছে বটে। পাশের বাড়ি থেকেই সুরটা আসে। গলাটা ভীষণ চেনা চেনা, কিন্তু কার যে গলা, তা ভাল করে ঠাহর করতে পারছেন না মিহিরবাবু।

এই বাড়িতে মিহিরবাবু ভাড়া এসেছেন সপ্তাহখানেক হলো। আসার পর দিনই শুনেছিলেন মহিলা কণ্ঠটি । 'জাগো মোহন  পেয়ারে'। শুধু এই এক লাইন। এর চেয়ে বেশি আর কোনও পংক্তি গান না মহিলা। কিন্তু যত টুকুই গান, তা-ই অপূর্ব। মন কেমন করা।  আরও শোনার সাধ জাগে।

মিহিরবাবু কণ্ঠস্বরটিতে আবিষ্ট হয়ে আছেন। সর্বক্ষণের সঙ্গী রবিনকেও ডেকে শুনিয়েছেন। রবিন বিজ্ঞের মত মাথা নাড়িয়ে বলেছিল, মোবাইলে কেউ গাইছে। ওই যে কী আছে না টিউব। যাতে গান আসে, ভিডিও দেখা যায়।

'হারামজাদা ইউটিউব। এটা মোবাইল না। কেউ গাইছে। যা তুই কাজ কর গিয়ে। এ সব তুই বুঝবি না।' মেজাজ খিঁচড়ে গিয়েছিল মিহিরবাবুর। মনে হয়েছিল এ ভাবেই মানুষ উলু বনে মুক্তা ছড়ায়।

কিন্তু  মিহিরবাবুর ভেতর যে মিহিরবাবু আছেন তিনি এই অল্প গানের সুরের সঙ্গে অতীতের সিন্দুকে রাখা এক স্মৃতিকে মেলানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। অনবরত। কিছু খুঁজতে গিয়ে লোডশেডিং হলে মানুষ যেভাবে হাতড়ায় ঠিক সেভাবে। এলোপাথাড়ি। পাচ্ছেন না কিছুই। কিন্তু সুরটা তাকে টানছে। অতীতে। ফেলে আসা সময়ের অলিতে-গলিতে। যেখানে তিনি আর আরেকজন পাশাপাশি হেঁটেছেন। অনেক দিন। সেই মানুষীকে মনে রাখার জন্যই  তো বিয়ে করেননি। জড়াননি 'নব প্রেম জালে'।  চাকরির সূত্রে বেড়িয়েছেন অনেক জায়গায়। কিন্তু কাউকে মন দেন নি। সেটা সামলে রেখেছেন প্রথম প্রেমের জন্য।

প্রথম প্রেম! ভুলতে চাইলেও ভোলা যায় না। যেমন অরুন্ধতীদেবীকে ভুলতে পারেন নি মিহিরবাবু। পারবেনও না। সকালের সুরটা যেন এই না ভোলাকে আরও বেশি প্রবল করে তুলেছে। কারণ অরুন্ধতী রাগ ভৈরবটাইতো এক সময় শুনিয়েছেন  নিজের 'মেঘ'কে। মানে মিহিরবাবুকে।

না, সুরটা ক্রমশ যেন মাথার কলকব্জাকে বিকল করে দিচ্ছে, টের পাচ্ছেন মিহিরবাবু। এর একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে। তাই আজ সুরটা সকাল সকাল ভেসে আসতেই, পাশের বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন বছর সত্তরের মিহিরবাবু। হাঁটুর ব্যথাটা কাল থেকে ভোগাচ্ছে। কিন্তু আজ ব্যথাও তাঁকে আটকাতে পারবে না।

গেটটা ঠেলে, সাতপাঁচ না ভেবেই সটান ঢুকে পড়লেন। সুরটা ওপরের তলা থেকে আসছে। এক চল্লিশ উর্ধ্ব যুবক বারান্দায় বসে পত্রিকা পড়ছেন।

'হ্যাঁ বলুন'

'আমি আপনার পাশের বাড়ির'

'হ্যাঁ হ্যাঁ চিনি আপনাকে। বলুন কী ব্যাপার'

'ওই... ইয়ে... গানটা কে গাইছে জানতে পারি?'

'আমার মা'

'ওহ! বড্ড চেনা সুর। ঠিক এমনই সুরেলা কণ্ঠস্বরের একজনকে চিনতাম। আচ্ছা আমি কি আপনার মা'কে একবার দেখতে পারি। যদি খারাপ না পান। '

'হ্যাঁ, দেখতে পারেন। '

সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলেন মিহিরবাবু। চাপা উত্তেজনা রক্তে বইছে। পর্দার আড়াল থেকে সুরটা আসছে। পর্দা সরাতেই বিস্মিত তিনি। এতো অরুন্ধতীদেবী! বিস্ময়ে গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না তাঁর। কিছু বলার আগেই গান থেমে গেল। অরুন্ধতীদেবী তাকালেন মিহিরবাবুর দিকে। অপলক চাউনি। বুকটা ঢিপ ঢিপ করছে। এত এত বছর পর  দেখা। হাসলেন অরুন্ধতী। পাল্টা হাসলেন মিহিরবাবু।

'বাবা, বসো, খেয়ে যাবে। আলু সেদ্ধ খাবে?'

মিহিরবাবুর মাথা কাজ করছে না। এ সব কী বলছেন অরুন্ধতী দেবী। বিস্ময় নিয়ে তিনি পাশের যুবকের দিকে তাকালেন।

দীর্ঘশ্বাস মাখানো উত্তর এলো,

'মায়ের ডিমেনশিয়া, সব স্মৃতিই আস্তে আস্তে লোপ পেয়ে গেছে। কিন্তু আশ্চর্য জানেন তো,  গানের এই একটা পংক্তিই শুধু মনে আছে'!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই সপ্তাহের জনপ্রিয় পোষ্ট

আকর্ষণীয় পোষ্ট

প্রান্তিক জীবন যেখানে রোদ্দুর লিখতে চায়

। চন্দ্রিমা দত্ত । অনলাইন থেকে মুদ্রিত সংস্করণ 'প্রতাপ' প্রথম খণ্ড যেদিন সম্পাদক কবি শৈলেন দাস আমার হাতে এনে দিল খুব আনন্দ হচ্ছিল আম...