যাত্রাপথের এক জীবনকথা

প্রতাপ : অনলাইন-৪২

। শৈলেন দাস ।

    প্রফুল্ল চন্দ্র সরকার—চাতলা হাওরের সন্ন্যাসী টিলায় জন্ম নেওয়া এক নিরলস যাত্রাশিল্পীর নাম। পিতা পরেশ চন্দ্র সরকার। পড়াশোনার হাতেখড়ি রাজপুর হাইস্কুলে, পরবর্তী সময়ে রাধামাধব কলেজে শিক্ষা লাভ। কিন্তু তাঁর জীবনের মূল পাঠশালা ছিল যাত্রামঞ্চ—আলো, সংলাপ আর মানুষের আবেগে ভরা সেই জগৎ।

    ১৯৮৯ সালে যাত্রাপালার সঙ্গে তাঁর পথচলা শুরু। প্রথম যাত্রাপালা “মা মাটি মানুষ”-এ মায়ের চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে যাত্রাজগতে প্রবেশ। এরপর একে একে অভিনয় করেন নিহত গোলাম, কৈফিয়ত, জীবন নিয়ে জুয়া, সন্ন্যাসী রাজা, কলঙ্কিনী বধূ, মহারাজা হরিশচন্দ্র—সহ বহু জনপ্রিয় যাত্রাপালায়। সেই সময় তাঁদের যাত্রাদলের ম্যানেজার ও প্রম্পট মাস্টার ছিলেন অনিল চন্দ্র দাস—যিনি যাত্রাশিল্পে শৃঙ্খলা ও দিকনির্দেশনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।


১৯৯৩ সালে অনিল চন্দ্র দাস একটি যাত্রাবিষয়ক বই লেখেন, পাশাপাশি রাজপুরের হরি মোহন দাসও একটি যাত্রাগ্রন্থ রচনা করেন। এই সময় দলগত কিছু মনোমালিন্য দেখা দেয়। তখন বড় ভাই নিরঞ্জন সরকারকে সঙ্গে নিয়ে নিজ গ্রামেই যাত্রাদল গঠনের চিন্তা শুরু হয়। সেই ভাবনা থেকেই প্রফুল্ল চন্দ্র সরকার নিজে যাত্রাপালা রচনায় হাত দেন। মাত্র এক মাসে রচিত হয় তাঁর প্রথম যাত্রাপুস্তক “গোলামের অত্যাচার”। বইটি পড়ে বড় ভাই নিরঞ্জন সরকার অত্যন্ত আনন্দিত হন।

পরবর্তীতে পাশের গ্রাম বাঁশটিলায় বন্ধুদের নিয়ে শুরু হয় নিয়মিত রিহার্সেল। প্রায় দুই মাসের প্রস্তুতির পর বাঁশটিলাতেই “গোলামের অত্যাচার” মঞ্চস্থ হয়। তখন শিলচর থেকে শিল্পী এবং বড়জালেঙ্গা থেকে লাইট-মাইক সংগ্রহ করা হয়। সেই প্রথম মঞ্চায়নেই দর্শকদের বিপুল ভালোবাসা ও সমর্থন শিল্পীর মনে গভীর ছাপ ফেলে।

    পরবর্তী অধ্যায় শুরু হয় শিলচরের আশ্রম রোডে। সেখানে একটি কাপড়ের দোকান খোলার পাশাপাশি পুজোর আগেই যাত্রার রিহার্সেল চলতে থাকে। আশ্রম রোডে তাঁর লেখা প্রথম যাত্রাপালা “গরিবের আর্তনাদ” মঞ্চস্থ হয়—ম্যানেজার ছিলেন গোপাল দাস, সহযোগিতায় প্রহ্লাদ পাল।

    ২০১১ সালে সৎসঙ্গ মন্দিরে উৎসবের আগের দিন “মহারাজা হরিশচন্দ্র” পালা মঞ্চস্থ হয়। কিন্তু সেই বছরই এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তাঁর দোকানপাট সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যায়। জীবনের সেই কঠিন সময়ে এক বছর যাত্রাপালা থেকে দূরে থাকতে হয় তাঁকে।

    এই দীর্ঘ যাত্রাপথে তিনি তিনটি যাত্রাপুস্তক রচনা করেন— ১) গোলামের অত্যাচার ২) হিন্দুর ছেলে মুসলমান ৩) প্রেমের সমাধি । দুঃখের বিষয়, বর্তমানে তাঁর কাছে এই বইগুলোর কোনোটিই সংরক্ষিত নেই, আর নতুন করে লেখার আগ্রহও আর অবশিষ্ট নেই। তবুও যাত্রা তাঁকে ছেড়ে যায়নি। কাছার পুলিশ নাট্য সংস্থার শ্যামল চক্রবর্তীর আহ্বানে তিনি পুলিশ রিজার্ভে দীর্ঘদিন যাত্রাপালার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। সেই সময়ে পাশে পান প্রিয় বন্ধু অলক চক্রবর্তী ও চন্দন চক্রবর্তীকে—যাঁদের সহযোগিতা আজও তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।

    ২০২১ সালে তাঁর লেখা “গোলামের অত্যাচার” পালাটি ১৭ নাইট মঞ্চস্থ হয়। সেই সময় পাশে ছিলেন ভাতিজা আশীষ সরকার—প্রম্পট মাস্টারের দায়িত্বে। প্রতি বছরই কোনো না কোনোভাবে যাত্রাপালার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন তিনি।

    সবশেষে, ২০২৫ সালে নিজের মতো করে, প্রিয় বন্ধুদের নিয়ে মঞ্চস্থ করেন যাত্রাপালা “জীবন নদীর তীরে”—চাতলা হাওরের শ্যামপুর গ্রামের কালীমণ্ডপে। দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা, হার-জিত, আনন্দ-বেদনা—সব মিলিয়ে সেই পালা যেন তাঁর নিজের জীবনকথারই প্রতিধ্বনি।

যাত্রা ছিল তাঁর নেশা, সাধনা আর জীবন—আজও স্মৃতির মঞ্চে সেই আলো জ্বলে থাকে

1 টি মন্তব্য:

এই সপ্তাহের জনপ্রিয় পোষ্ট

আকর্ষণীয় পোষ্ট

প্রান্তিক জীবন যেখানে রোদ্দুর লিখতে চায়

। চন্দ্রিমা দত্ত । অনলাইন থেকে মুদ্রিত সংস্করণ 'প্রতাপ' প্রথম খণ্ড যেদিন সম্পাদক কবি শৈলেন দাস আমার হাতে এনে দিল খুব আনন্দ হচ্ছিল আম...