
। দেবতোষ নাথ ।
বৈচিত্র্যেভরা এই পৃথিবীতে পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সৃষ্টির পর মুহূর্ত থেকেই এই প্রক্রিয়া চালু হয়ে গেছে। পৃথিবীতে মানবরূপী জীবের আবির্ভাবের পর এই প্রক্রিয়া আরো দ্রুততর হতে থাকলো। আর বিংশ শতকের মধ্যভাগ থেকেই পৃথিবী যেন সম্পূর্ণ পাল্টে গেল। প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে সাথে পাল্টে যেতে থাকলো মানুষের মানসিকতা, চিন্তা ভাবনা। নগরায়নের দ্রুত অগ্রগতিতে ধ্বংস হতে থাকলো প্রকৃতি, উদাও হয়ে যেতে থাকলো পল্লীর শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশ। বিজ্ঞানের এই জয় জয়কারে একদিকে যেমন আজ গোটা পৃথিবী মানুষের হাতের মুঠোয় এসে গেলো, মানুষ সুখ-সুবিধে উপভোগের চূড়ান্ত পর্যায়ে যেমন পৌঁছে গেল, তেমনি প্রকৃতি ধ্বংস হওয়ার ফলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রচণ্ডভাবে ব্যাহত হলো, মানুষ ক্রমে যন্ত্রমানব হয়ে ওঠতে থাকলো। মনের আবেগ-উচ্ছ্বাস, প্রেম-ভালোবাসা হারিয়ে গেলো ঐশ্বর্যের বাহ্য আড়ম্বরের মধ্যে।
আসামের কাছাড় জেলার দক্ষিণপ্রান্তের বাম অঞ্চল, যা এককালে ‘বনপারা’ নামে পরিচিত ছিল, পরিবর্তনের ছোঁয়ায় তারও আজ আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে। বনপারার আমল তো অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছে, ‘বন’ বলতে যা কিছু পশ্চিমের রেংটি পাহাড়ে অবশিষ্ট আছে, আজ তা-ও বিপন্ন। মানুষের আগ্রাসী থাবা থেকে আজ জল-স্থল-আকাশ-বাতাস কিছুই সুরক্ষিত নয়।
এককালে অরণ্যসমৃদ্ধ বাম অঞ্চল ছিল বিভিন্ন প্রজাতির পাখির স্বচ্ছন্দ বিচরণ ভূমি। শুধু বাম অঞ্চলই নয়, আসামের মোট ভৌগলিক পরিসীমার শতকরা মাত্র ৮.৮ ভাগ নিয়ে গঠিত বরাক উপত্যকা ছিল আসামের সমস্ত পক্ষীকুলের ৩০ শতাংশের বাসভূমি। গবেষকদের মতে আসামের মোট ৯০০ প্রজাতির পাখির মধ্যে ২৩৯ প্রজাতির পাখিই এই উপত্যকায় পাওয়া যেতো। এর মধ্যে কিছু প্রজাতি পরিযায়ী হলেও ১১৪টি প্রজাতির পাখিই কিন্তু স্থানীয়। কিন্তু বর্তমানে এই পরিসংখ্যান আসামের অন্যান্য স্থানের তুলনায় ক্রমশ নিম্নগামী। এককালে প্রচুর ময়ূর যদিও আনন্দে ঘুরে বেড়াতো এই অঞ্চলে, কিন্তু আজ তা কষ্ট কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। ধনেশ, চিল, বাজ, শকুন ইত্যাদি পাখিকে তো বর্তমানে দেখাই যায় না ।
দুপুরবেলা যখন অনেকগুলো চিল আকাশে ডানা মেলে ভাসতে থাকতো আর ক্রমশ উপরে উঠতে উঠতে দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যেতো, সেই অপূর্ব দৃশ্য যারা দেখেছেন, তারা সত্যিই ভাগ্যবান। শোনা যায়, ছোট ছেলে-মেয়েরা বড়শি (ছিপ) দিয়ে মাছ ধরতে গেলে অনেক সময়ই কোন চিল হঠাৎ ছুঁ মেরে কোন মেয়ের হাতের মাছের ঝুটাটা-ই নিয়ে যেতো। হয়তো সেই ঘটনা থেকেই পরবর্তিতে ছোট ছেলে-মেয়েদের মধ্যে সে সময়ের জনপ্রিয় ‘আড়কি শিছইন’ খেলাটির জন্ম হয়েছিল। খেলাটিতে ছেলে-মেয়ে সবাই এক জায়গায় চক্রাকারে বসে হাতের আঙ্গুল সোজা করে মাটিতে রাখে। তারপর একটির পর একটি হাতের পৃষ্ঠদেশে কিল মেরে মেরে ছড়া আওড়ানো হয়,-
‘আড়কি শিছইন দাড়কি পিছইন
রাজার ঘরো কুকুড়ি .......... বুম্বাই মাত্তম, থেং থেঙ্গা।’
এই ‘থেঙ্গা’ শব্দটির সাথে যার হাতে কিল পড়বে, সে হাত সরিয়ে নিয়ে পেছন দিকে লুকিয়ে রাখবে। এভাবে ক্রমান্বয়ে প্রত্যেকের হাত লুকানোর পালা শেষ হলে তাদের মধ্যে প্রশ্নোত্তর পর্ব চলবে -
ও ছুটি তর আত কানো ? চিলে নিছে।
চিল কানো ? বা-বনো।
বা-বন কানো ?
শেষ প্রশ্নটির উত্তর না দিয়ে সবাই তখন হাত বের করে দেখাতে থাকবে ।
বাম অঞ্চলের পানিভরা, রামপ্রসাদপুর বা লাল্টুগ্রামের ওপর দিয়ে একসময় অনেকগুলো বিরাট আকারের ধনেশ পাখিকে ওড়ে যেতে দেখা যেতো। ভুবন পাহাড় থেকে সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে রেংটি পাহাড়ের উঁচু গাছগুলোতে গিয়ে পাখিগুলো বসতো। ওড়ে যাওয়ার সময় বাতাস কেটে যাওয়া বিশাল ডানার সাঁ সাঁ আওয়াজের সাথে তাল মিলিয়ে অনেকটা রাজহাঁসের মতো ডাক শোনেই বুঝা যেতো ধনেশ পাখিরা ওড়ে যাচ্ছে। অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর সে দৃশ্য। নীল আকাশের বুক চিরে তাদের এভাবে ওড়ে যেতে দেখে শিশুরা আনন্দে চিৎকার করে সুর করে ছড়া কাটতো -
‘ধনেশ্বর ধনেশ্বর, মাঝর থাকি একগু পড়।’
কিন্তু ‘আপণা মাংসেঁ হরিণা বৈরী’। পাখিগুলোর লোভনীয় মাংস আর লম্বা ঠোঁট (যা নানা প্রকার ভেষজ তৈরিতে নাকি ব্যবহৃত হয়) তাদের জন্য কাল হয়ে ওঠলো। মানুষের লোভ-লালসার শিকার এই প্রজাতির পাখি বর্তমানে ভুবনপাহাড়ের গভীর অরণ্যে তাদের অস্তিত্ব কোনমতে রক্ষা করতে পেরেছে কি-না তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে।
মনে আছে, বাড়ির সামনের পুকুর পাড়ের উঁচু শিমুল গাছে যখন অনেকগুলো শকুন ওড়ে এসে বসতো, বাচ্চারা সবাই চিৎকার করে ছড়া কাটতো -
‘শকুন রাজা গৃধিনী, গরু মরছে দেখছোনি ’।
শকুন যেমন কিছুটা ভারিক্কি চালের পাখি, তেমনি গ্রামাঞ্চলের দাঁড় কাকগুলো শহরাঞ্চলের পাঁতি কাকের চেয়ে যেন অনেক গম্ভীর প্রকৃতির। চঞ্চল প্রকৃতির টুনটুনি, চড়ুই, পেঁচকুন্দা (ফিঙ্গে), ঢুবি বা ঘুঘু ইত্যাদি যেন অত্যন্ত ব্যস্ত পাখি - এক জায়গায় অধিক্ষণ বসার তাদের সময় নেই। দাঁড়কাকের অলস গতি লক্ষ করে পল্লীর কোন স্বভাবকবির মুখ থেকে হয়তো বেরিয়ে গিয়েছিল এই প্রবাদটি -
‘কাউয়া সাজতে সাজতেউ পেচকুন্দা রাজা’।
দূরদূরান্তরের পরিযায়ী পাখিদের কলকাকলীতেও এক সময় মুখরিত হয়ে ওঠতো বাম অঞ্চল। বরাক উপত্যকার আরো দু’একটি স্থানের মতো বাম অঞ্চলেও কখনো কখনো দেখা যেত সাত সমুদ্র তেরোনদী পেরিয়ে সাইবেরিয়া থেকে ওড়ে আসা খঞ্জনা, মিটুয়া ইত্যাদি পাখি কিংবা কাজাকস্তানের বলখাস অঞ্চল থেকে আসা পায়ে আংটি পরা গোলাপী পেলিকান ‘গগনবেড়’। বর্তমানে এদের আর চোখে পড়ে না।
বাড়ির পাশের স্যাঁতসেতে মুরতা (মূর্বা বা মুরগা) গাছের ঝোপে কিংবা বাঁশের ঝাড়ের আড়াল থেকে বর্ষার সময় ভেসে আসা মউকা বা মহাকলের ‘ডুব-ডুব-ডুব’ ডাক এক মায়াবি পরিবেশের সৃষ্টি করতো। তেমনি কচুরিপানার দিক থেকে ভেসে আসা ‘ওয়াও ওয়াও’ আওয়াজ শুনে যে কোন লোক চমকে ওঠতে বাধ্য। পা লম্বা, সাদাকালো মেশানো রঙের লম্বাগলা ছোট মুরগির মতো দেখতে ডাহুকের সন্ধেবেলা এক নাগাড়ে ভেসে আসা ডাক শুনে মনে হতো কোন ছোট্ট শিশু কান্না করছে।
উঠোনের উত্তর-পূর্বকোণে বিশাল আমগাছটিতে ঝাঁকে ঝাঁকে টিয়া এসে বসতো। তাদের উৎপাত থেকে আমগুলোকে বাঁচাতে বড়োদের চেষ্টার ত্রুটি থাকতো না ঠিক, কিন্তু এতে তাদের খুব একটা হেল-দোল লক্ষ করা যেতো না। দুডালা (গুলল বা গুলতি) দিয়ে বা হাত দিয়ে ছোড়া পাথরের নুড়ি উঁচু গাছটির মাথা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারতো না বলে টিয়াগুলোও বেপরোয়াভাবে তাদের তাণ্ডব-উৎপাত নিশ্চিন্তে প্রায় ঘণ্টাখানেক চালিয়ে আবার দলবেধে ফিরে যেতো। ছোটরা অবশ্য এতে খুব উপকৃত হতো। অজস্র কাঁচা-পাকা, পাখির ঠোকরানো আমে গাছের তলা ভরে যেতো।
ঠিক দুপুরবেলা আমগাছটির ডালে বসে কাঠাল পাখি (বউ কথা কও) যখন ডেকে ওঠতো, তখন অনেকে অনেক রকম এর ব্যাখ্যা দিতো। সুরতুলে ছোটরা কাঁঠাল গাছে ঝুলে থাকা কাঁঠালগুলোর দিকে তাকিয়ে পাখির সাথে সাথে গাইতো ‘কাঠাল পাকা’, অনূঢ়া পিসি ভাবতো ‘মোর কতো দুখ’ আর আদরের ছোট ভাইটি অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়ায় পাশের বাড়ির শ্যামলীদির অন্তরের বিলাপ ‘ভাইরে খাইছে বনের বাঘে’। আসলে ‘যার যেমন কান, তেমনি শুনে’। বাঁশি বাজছে দূর বনে, শ্রীমতি শোনছেন ‘রাধা রাধা’, রাখালরা শোনছে ‘সখা সখা’, আবার স্নেহময়ী মায়ের কানে বাজছে ‘মা যশোধা’ হয়ে।
ঢুবি বা ঘুঘু পাখিকে নিয়ে শৈশব থেকেই শোনে আসা একটি ঘুমপাড়ানি ছড়া বেশ মনে পড়ে,-
‘ঢুপিরে ঢুপি তোর ঠোট কেনে কালা ?
আলং গুটা খাইয়া ...... ।’
এই ঘুঘু পাখিকে নিয়ে অনেক ছড়া গ্রামাঞ্চলে প্রচলিত। ছোট্ট শিশুকে কোলে নিয়ে মমতাময়ী জননী হয়তো আদর করে ছড়া কাটেন-
‘ঢুপিরে ঢুপি আইলে আইলে যাইচ, রাজার কটকটি ধান খুটিয়া খাইবে চাইচ ....... ।’
এরকমই আরেকটি ঘুমপাড়ানি দীর্ঘ ছড়ার কিছু অংশ-
‘ঢুপিরে ঢুপি জালা পালাইতে কই?
বেলাইন গাছর তলে,
ঝাড়তে বেলাইন পড়ে, সাপে লেঙ্গুড় লাড়ে .....।’
সরলতা মাখা গ্রামীণ জীবনে অর্থহীন অনেককিছু থেকেও আনন্দ লাভ করা যায়। এই আনন্দ লাভের জন্য যেমন বিশেষ কোন প্রস্তুতির প্রয়োজন পড়ে না, তেমনি যা থেকে আনন্দ লাভ হচ্ছে, সে বিষয়টা এখানে গৌণ। লক্ষ্মীপেঁচাকে উদ্দেশ্য করে গ্রাম্য শিশুদের মুখে এজন্যই শোনা যায় -
‘পেচা রে পেচা,
তর কুন কান কাটা, কুন কান ভালা,
ফিরাই লরাই দেখা।’
এসবের মাধ্যমে প্রকৃতির সাথে মানুষের সুনিবিড় সম্পর্কের ব্যাপারটিও ফুটে ওঠে।
বাবুই পাখিগুলো মুখে খাবার নিয়ে ওড়ে এসে যখন সুপুরিগাছের পাতায় ঝুলে থাকা তাদের সযত্ন-নির্মিত কারুকার্যময় শিল্পকর্মটির ওপর বসতো আর হালকা বাতাসেই দোলতে থাকতো - সেই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য কি কখনো ভুলা যায়! বাবুই পাখির বাসাকে নিয়ে এক মজার ধাঁধাও বাম অঞ্চলে প্রচলিত -
‘শূন্যে ঘর, তলেদি দুয়ার / কেমনে হামাইবা রাজার কুমার ।’
বাম অঞ্চলের এই সুন্দর ছবিগুলো আজ হারিয়ে যেতে বসেছে । সীমাহীন লোভের বশবর্তী মানুষের এই প্রকৃতি ধ্বংসের খেলা বন্ধ না হলে অনেককিছুই আমরা হারিয়ে ফেলবো। তবে চেষ্টা করলে এখনো অনেককিছুই চিরবিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।
এখনো অনেক পাখিই বাম অঞ্চল সহ গ্রাম বরাকের বেঁচে থাকা ঝোপ-ঝাড়, পাহাড়-টিলা বা বিল-হাওর-আনোয়া ইত্যাদিতে টিকে থাকার কঠিন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। গৃহপালিত হাঁস-মুরগি ছাড়াও কাক, কোকিল, কানাকোয়া, কাঠঠুকরা, কাদাখোঁচা, কাস্তেচোরা, কাজলপাখি, খঞ্জনা, ময়না, চড়ুই, মাছরাঙা, গাঙচিল, চাতক, টিয়া, টুনটুনি, শালিক, গাঙশালিক, ঝুঁটশালিক, পেঁচকুন্দা (ফিঙ্গে), বাঁশপাতি, ফটিকজল, শামাপাখি, বুলবুল, তোতা, দইওল (দোয়েল), বাগাডাইয়া, বাবুই, পাতকৌড়ি, শামুকভাঙরি, জলপিপি, বাঠান, পায়রা, জলালী পায়রা, বনমোরগ, তিতির, লালঠেঙ্গি, হাঁড়িচাচা, মদনটাক, মিটুয়া, মোহনচূড়া, মৌটুসী, সারালী হাঁস, নীলকণ্ঠ, পরাগপাখি, বালি হাঁস, জিরিয়া, তেলিমুনিয়া, ফটকা, বিভিন্ন প্রজাতির বক (খয়েরি বক বা কানা বক, সাদা বক ইত্যাদি), বিভিন্ন ধরনের পেঁচা (কুটুরে পেঁচা, কুরুলে পেঁচা, হুতুম পেঁচা ইত্যাদি। পেঁচার বরাক উপত্যকার স্থানীয় নাম ‘ভিজুতুতু’), ছলাকাক (এক ধরনের বৃহৎকায় সারস) সহ বিভিন্ন ধরনের সারস ইত্যাদি পাখি ছাড়াও বিপুল সংখ্যক বাদুড়, চামচিকার মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীরা এককালে নির্ভয়ে এই সজল-শ্যামল অঞ্চলটিতে ওড়ে বেড়ালেও আজ এদের সংখ্যা অনেকটাই কমে গেছে।
হাঁস, পায়রা, গরু, ছাগল ইত্যাদি গৃহপালিত পশু-পাখি পালন গৃহস্থবাড়ির শুধু শোভা বর্দ্ধনের জন্য ছিলনা - এগুলোকে অন্যতম সম্পদ মনে করা হতো । প্রবাদেই আছে-
‘আসে উনা, পারয় দুনা / ছাগলে পিন্দায় কানর সুনা’।
(আস=হাঁস, পারয়=পায়রায়, পিন্দায়=পরায়, কানর=কানের, সুনা=সোনা)
প্রবাদটির মাধ্যমে যদিও ছাগল পালনে হাঁস বা পায়রা পালনের চেয়ে বেশি উপার্জন হয় বলে মনে করা হয়েছে, কিন্তু হাঁস, পায়রা বা ছাগল পালন যে এক অত্যন্ত লাভজনক বৃত্তি, সেটাই বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে ।
পশু-পাখিকে নিয়ে ধাঁধা বা হেঁয়ালি এবং প্রবাদবাক্য বাম অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল বা এখনো কিছু কিছু আছে। এগুলোর মধ্যে যেমন তীক্ষ্ণ মেধা লুকিয়ে আছে, তেমনি অপরূপ ছন্দের মাধুর্যও অবাক করে দেওয়ার মতো। যেমন -
‘কাউয়ার বাদাত কুলির ছাও / জাত আনমান কাড়ে রাও।’
অর্থাৎ কাকের বাসায় কোকিলছানা লালিত-পালিত হলেও তার কুহু ডাক বদলাবে না। তারমানে জাতিগত বা বংশগত বৈশিষ্ট্য অপরিবর্তনীয়।
বাম অঞ্চল সহ বরাক উপত্যকায় এখনো বহু প্রজাতির পাখি দেখা যায়। এখনো সবগুলো পাখি একেবারে অবলুপ্ত হয়ে যায় নি। তাই শুধুমাত্র সরকারি প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়, স্থানীয় জনগণ এ ব্যাপারে এগিয়ে না এলে এসব পাখিদের সংরক্ষণ সম্ভব নয়। প্রকৃতির সাথে লড়াই করে, আগ্রাসী মানবসমাজের হিংসা আর লোভের হাত থেকে কোনমতে যেসব পাখি এখনো তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে, উপযুক্ত ব্যবস্থা না নিলে গোটা বরাক উপত্যকা থেকেই একদিন তারা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এসব পাখি তখন শুধুমাত্র বরাক উপত্যকার পশু-পাখির ইতিহাসের পাতায় আর জনশ্রুতিতেই স্থান পাবে - বাস্তবে নয়।
[লেখকের বরাক উপত্যকার সংস্কৃতি, ইতিহাস, পশু-পাখি, গাছ-পালা, খেলা-ধুলো ইত্যাদির ওপর লেখা ‘মন চলো নিজ নিকেতনে’ গ্রন্থটি থেকে সংকলিত ও সংক্ষেপিত ]
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন