। প্রদীপ চন্দ্র দাস ।
অভয় একটি প্রত্যন্ত গ্রাম বিজয়নগরে বাস করত। ছোটবেলা থেকেই সে অত্যন্ত মেধাবী ছিল। সে অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের ছেলে। পড়াশোনাতে অত্যন্ত ভালো থাকায় শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দের খুবই প্রিয়পাত্র ছিল। সে ছিল খুবই তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন। সকলেই তার বুদ্ধির প্রশংসা করত।
পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে অভয় খুব সুন্দর গানও করতে পারত। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে সে তার বাড়ি থেকে সাত কিলোমিটার দূরে একটি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হল। তার কাছে কোনো সাধন না থাকায় সেই সুদীর্ঘ রাস্তা পায়ে হেঁটেই যেত। নতুন স্কুল, নতুন বন্ধুবান্ধব, নতুন শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দ। সে এই নতুন পরিবেশে অত্যন্ত খুশি।
এদিকে হতদরিদ্র বাবা অতি কষ্ট করে কোনোরকমে সংসার চালাতেন। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা। তবুও সে স্বপ্ন দেখে বড় হওয়ার, লক্ষ্যে পৌঁছানোর। তার বিদ্যালয়ে বিভিন্ন গ্রাম থেকে অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরাও ভর্তি হয়েছিল। তাই পড়াশোনার ক্ষেত্রে তার সামনে এক বিরাট প্রতিযোগিতা।
ভর্তি হওয়ার এক মাসের মধ্যেই স্কুলে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। মেধাবী অভয়ও এই সুযোগটি হাতছাড়া করতে চায়নি। তার সুললিত কণ্ঠে একটি সুমধুর সঙ্গীত পরিবেশন করে সে সকলকে মুগ্ধ করে দিল। শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত তার সাবলীল ভাষণও তার মেধার পরিচয় দিয়েছিল। অভয় সকলের চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে গিয়েছিল। সকলেই তাকে নিয়ে খুব গর্ববোধ করত।
কিন্তু কঠোর পরিশ্রম করেও সে ষান্মাসিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করতে পারেনি। সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হল যে তাকে আরও সাধনা করতে হবে। তাকে প্রথম হতেই হবে। বাড়ি থেকে স্কুলটি অনেক দূরে থাকায় এবং পায়ে হেঁটে যাওয়ার জন্য সে অত্যন্ত পরিশ্রান্ত হয়ে যেত। সে খাওয়া-দাওয়া করে একটু বিশ্রাম নিত, তারপর সে তার সাধনায় মগ্ন হয়ে যেত।
এভাবে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে সে বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে নিল। শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দ সকলেই তার সাফল্যে মুগ্ধ ছিলেন। তার আত্মপ্রত্যয়, আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গিয়েছিল। তার মনে একই গুঞ্জন ছিল, “আমি পারব।”
তার হর্ষিত মুখ, সরল চরিত্র এবং সকলের প্রতি সমভাব তাকে সকলের প্রিয়ভাজন করে তুলেছিল। শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দের তাকে নিয়ে অনেক প্রত্যাশা ছিল। বিজ্ঞান শিক্ষক প্রিয়রঞ্জন দত্তের অবদান তার ক্ষেত্রে অনেক বেশি। তিনি তাকে খুব ভালোবাসতেন। সবসময় তাকে উৎসাহ দিতেন পাঠ্যবই পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গল্পের বই পড়ার জন্য এবং মহাপুরুষদের আত্মজীবনীমূলক অনেক বইও প্রদান করতেন। তিনি প্রায়ই তাদের বাড়িতে যেতেন এবং তার মা-বাবাকেও খুব উৎসাহিত করতেন ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করানোর ব্যাপারে।
কঠোর অধ্যবসায় এবং সাধনার ফলস্বরূপ অভয় মেট্রিক পরীক্ষায় অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে সব বিষয়ে লেটার মার্কসসহ ডিস্টিংশন নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিল। তার এই সাফল্যে বন্ধু-বান্ধব, শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দ সকলেই আনন্দের জোয়ারে ভাসছিল। তার সাফল্যের কথা গ্রামেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। সবাই তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। যারা সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল তারা হল তার মা-বাবা আর ভাইবোন। সে নিজেও ছিল আনন্দে আত্মহারা।
এবার শুরু হল অভয়ের আসল অগ্নিপরীক্ষা। একদিকে পরিবারের অচলাবস্থা, অন্যদিকে তার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর তীব্র ইচ্ছা, বড় হওয়ার স্বপ্ন। সে কী করবে ভেবে কোনো কুল পাচ্ছিল না। সে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। অবশেষে সে সিদ্ধান্ত নিল, “আমি পড়বই। আমার পরিবারের জন্য আমাকে যেভাবেই হোক দাঁড়াতেই হবে।” সে টাকা ধার নিয়ে দুঃসাহস করে শহরে একটি কলেজে ভর্তি হয়ে গেল। তার একটাই চিন্তা ছিল পড়াশোনা, পড়াশোনা আর পড়াশোনা। কিন্তু কীভাবে? অজানা, অচেনা জায়গা। তার অপরিণত মনে বারংবার শঙ্কার উৎপত্তি হত, সে পারবে তো? সে একাই একটি ঘর ভাড়া করে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল। শিক্ষক প্রিয়রঞ্জন দত্ত তাকে কিছু টিউশন করারও ব্যবস্থা করে দিলেন। সে সকালে এবং বিকালে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে টিউশন করত এবং দিনের বেলা কলেজে যেত।
নিজে রান্না করে খাওয়া, কলেজ করা, টিউশন করে পড়াশোনা করা যে কত কঠিন বিষয় ছিল সেটা অভয় ছাড়া আর কেউ কল্পনাও করতে পারত না। কিন্তু সে হার মানেনি। সে যে অন্য ধাতুতে গড়া। সে দাঁড়াবেই। সে তার লক্ষ্যে ছিল অবিচল এবং অটল। সে এভাবে কঠোর সাধনা করে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। তার ছোট ভাইবোনেরাও তার পথ অনুসরণ করে এবং সুপ্রতিষ্ঠা লাভ করে। আজ এই পরিবার বিজয়পুর গ্রামের এক আদর্শ পরিবার। এই গ্রামের সকল ছেলেমেয়েদের জন্য বিশেষ অনুপ্রেরণা।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন