। দীপক সেনগুপ্ত ।
১৯৬১ সালের ১৯শে মে তারিখে দক্ষিণ আসামের শিলচর রেলস্টেশনে পুলিশের গুলিতে এগারো জন ভাষা সৈনিক আত্মবলিদান করে শহিদ হয়েছিলেন। ১৯৬০ সালের আসাম রাজ্যের ভাষা আইনের বিরোধিতায় এই আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল। উল্লেখিত আইনে অসমীয়া ভাষাকে রাজ্যে মাধ্যমিক পাঠ্যসূচিতে বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। বহুভাষিক আসামে ভাষাশিক্ষা নিজের পছন্দের হওয়া উচিত। অন্য কোনো ভাষার সঙ্গে সংঘাতে নয়, নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার এই লড়াই সব ভাষিক, এমনকি উদার অসমীয়া ভাষিক গোষ্ঠীরও সমর্থন পেয়েছিল।
মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার্থে ২১শে ফেব্রুয়ারির জনপরিচিতির কাছে ১৯শে মে অনেকটাই নিষ্প্রভ। স্বীকার করতে আপত্তি নেই যে ২১শে ফেব্রুয়ারির ছাত্র আন্দোলনের উৎস থেকে উৎসারিত গণআন্দোলন শুধুমাত্র একটি স্বাধীন দেশের জন্মই দেয়নি, বাঙালি জাতি এবং বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে সম্মানের সঙ্গে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করেছে। তুলনামূলক বিচারে ১৯শে মে একটি অসমাপ্ত সংগ্রাম, কিন্তু শুধু শহিদের সংখ্যার বিচারেই নয়, ব্যাপকতার বিচারে ১৯শে মে’র আন্দোলন ২১শে ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের থেকে অনেক ব্যাপক ছিল। ২১শে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন ছিল ছাত্র আন্দোলন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে সংগঠিত এই আন্দোলনে ছাত্ররাই আত্মবলিদান করে শহিদ হয়েছেন। অন্যদিকে, ১৯শে মে’র আন্দোলন ছিল সর্বাত্মক এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ আত্মবলিদান করে শহিদ হয়েছেন। একাদশ শহিদের একজনের নাম কমলা ভট্টাচার্য। স্কুল ফাইনাল পরীক্ষার্থী কমলা ভট্টাচার্য বিশ্বের প্রথম মহিলা ভাষা শহিদ।
খণ্ডিত দেশের দুই প্রান্তে প্রায় একই সময়কালে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ লক্ষ করা গেল। দ্বিজাতি তত্ত্বের অসাড়তা প্রমাণ করে ধর্ম নয়, ভাষাকে মৌলিক সত্তা প্রমাণ করে শুরু হল পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষার সম্মান রক্ষার্থে আন্দোলন। অন্যদিকে, ভারতের দক্ষিণ আসামের সমতল ভূমি, যা একদা অবিভক্ত কাছাড় ছিল, সেখানে গড়ে উঠল এক গণআন্দোলন। ১৯৬০ সালে আসাম বিধানসভায় গৃহীত রাজ্যভাষা আইনের বিরুদ্ধে মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার্থে ছিল এই আন্দোলন। খণ্ডিত দেশের দুই প্রান্তে ধর্মীয় সত্তাকে গুরুত্ব না দিয়ে ভাষিক পরিচয়ের শ্লাঘাবোধে একই সময়কালে দুই ভিন্ন রাষ্ট্রে, ভিন্ন সামাজিক প্রেক্ষাপটে আন্দোলন গড়ে উঠল।
একদিকে যখন পাকিস্তানের কায়েদ-ই-আজম মহম্মদ আলী জিন্না উর্দু ভাষা বাঙালিদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছিলেন, ঠিক তখন আসামের রাজ্যপাল অসমীয়া ভাষা বাঙালি-সহ অন্যান্য ভাষিক গোষ্ঠীর উপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে যেমন হিন্দু-মুসলমানের উজ্জ্বল সমন্বয় দেখা গিয়েছিল, অনুরূপ সমন্বয় ১৯৬১’র ভাষা আন্দোলনেও দেখা গিয়েছিল। ঘটনাচক্রে ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে সংগঠিত আন্দোলনে সব শহিদরাই ধর্মীয় পরিচয়ে মুসলমান, অন্যদিকে ১৯৬১ সালে শিলচর রেলস্টেশন চত্বরে সংগঠিত পুলিশের গুলিতে নিহত শহিদরা সবাই হিন্দু। মুসলমান অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষার সম্মানে প্রথম আওয়াজ তুলেছিলেন একজন হিন্দু, নাম ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৯৬০ সালের রাজ্যভাষা আইনের বিরুদ্ধে যে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল, তার নেতৃত্বে ছিলেন একজন মুসলমান জননেতা, আব্দুল মতলিব মজুমদার।
১৯৬০ সালে আসাম রাজ্যভাষা আইনে অসমীয়া ভাষাকে ‘রাজ্যিক’ ভাষা করা হল। মাধ্যমিক স্তরে পাঠ্যসূচিতে অসমীয়া ভাষা বাধ্যতামূলক হলে অবিভক্ত কাছাড়ের মানুষ তা মেনে নিতে পারেননি। দক্ষিণ আসামের সমতল ভূমি অবিভক্ত কাছাড়কে ১৮৭৪ সালে আসামের রাজস্ব বৃদ্ধির স্বার্থে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে পৃথক করে আসামের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। সেই থেকে অভিমান ও ভালোবাসা নিয়ে আসামের সঙ্গেই আছে, যদিও আসাম পরবর্তীতে অনেক সংকুচিত হয়েছে। বরাক উপত্যকায় পৃথকীকরণের দাবি বিক্ষিপ্তভাবে উঠলেও তা গণসমর্থন পায়নি।
নির্বাসিত এই বঙ্গভূমিতে বসে দীনবন্ধু মিত্র নাটক রচনা করেছেন ‘কমলে কামিনী’। মাইকেল মধুসূদনের ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’-এর প্রতি উত্তর রচনা করে শিলচর শহরের বাসিন্দা রামকুমার নন্দী মহাশয় যে সেতু রচনা করেছিলেন, পরবর্তীতে সেই সেতুর উপর দিয়েই চলছে অন্তহীন আসা-যাওয়া। শিলচর শহরের ছেলে অনিল চন্দ রবীন্দ্র-স্নেহধন্য হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। সুরমা উপত্যকার বর্ধিত এই অংশ, বরাক-কুশিয়ারা বিধৌত সমতলে, সিলেটি বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। দেশভাগের সময় গণভোট হয়েছিল। গণভোটের দৌলতে সিলেট ভারতে যোগ হয়নি। দেশভাগের বলি হয়ে যেমন কুমিল্লা-ময়মনসিংহের মানুষ এসেছেন ত্রিপুরায়, ঢাকা-বরিশালের লোক গেছেন পশ্চিমবঙ্গে, তেমনই সিলেট থেকে ছিন্নমূল হয়ে মানুষ আসামের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেলেন।
দেশভাগের বাস্তবতায় যে অভিশাপ নেমে এসেছিল, তার ফলশ্রুতিতেই আবর্তিত হচ্ছে আসামের রাজনীতি। দেশভাগের ফলে সৃষ্ট নাগরিকত্বের সংকটে একাধিক প্রজন্মের বাঙালিকে মূল্য দিতে হচ্ছে। ধর্ম, ভাষা এবং জাতিসত্তা, এই তিন তুরুপের তাসে চলে রাজনীতির খেলা। ক্ষমতার অলিন্দে বিচরণের নাম রাজনীতি, তার বিপ্রতীপে সামাজিক স্তরে অসমীয়া এবং বাঙালির কোনো দ্বৈরথ নেই। সাংস্কৃতিক সমন্বয় এবং সামাজিক আদান-প্রদান দুই সংস্কৃতিকেই সমৃদ্ধতর করছে, যেমন করেছিল অতীতেও। অসমীয়া ভাষাকে স্বীকৃতি প্রদানের ক্ষেত্রে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কথা সর্বজনবিদিত। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের হাত ধরে ভূপেন হাজারিকার সাংস্কৃতিক যুদ্ধ ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
যে রাজনীতি ১৯শে মে তারিখের রক্তাক্ত ইতিহাসের জন্ম দিল, সেই রাজনীতিকে বরাক উপত্যকার মানুষ বুঝতে পারেনি। যার ফলে ১৯শে মে তারিখের শহিদ দিবস উদযাপনের আনন্দেই থেকে গেল, স্মরণের গভীরতায় গিয়ে চেতনাকে স্পর্শ করতে পারল না। ১৯শে মে ১৯৬১, ইতিহাস সাক্ষী থাকল স্বাধীনতা প্রাপ্তির দেড় দশকের মধ্যেই স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রনিযুক্ত পুলিশের দ্বারা সহনাগরিকের হত্যা। সময় ১৯৬১-তে থেমে থাকল না, এই পথেই ১৯৭২ এবং ১৯৮৬ এল। একাদশ শহিদ থেকে দ্বাদশ হয়ে চতুর্দশে গিয়ে দাঁড়াল।
১৯শে মে তারিখের পুলিশি গুলিচালনার বিরুদ্ধে কলকাতা মহানগরীতে প্রতিবাদী সভা হয়। আনন্দবাজার-সহ বেশ কয়েকটি অগ্রণী পত্রিকা আন্দোলনকে সমর্থন করে সংবাদ পরিবেশন করেছিল। তারপর বিষয়টি বিস্মৃতির অন্ধকারে চলে যায়। যদিও বিক্ষিপ্তভাবে সাম্প্রতিক কালে কলকাতায় ১৯শে মে শহিদ স্মরণ করা হয়, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নয়। ১৯৬১ সালের ভাষা আন্দোলন বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াই ছিল না, এই আন্দোলনে সব ভাষিক গোষ্ঠী যোগদান করেছিল। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি নন্দকিশোর সিংহ আন্দোলনের সমর্থনে বিধায়ক পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন। গৌরবময় ইতিহাসের এই অধ্যায়কে বিস্মৃতির অন্ধকারে ছুঁড়ে ফেলা উচিত নয়।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন