। মধুমিতা দত্ত ।
“আমি চাই সাঁওতাল তার ভাষায় বলবে রাষ্ট্রপুঞ্জে,
আমি চাই মহুল ফুটবে শৌখিনতার গোলাপ কুঞ্জে,
আমি চাই নেপালি ছেলেটা গিটার হাতে,
আমি চাই তার ভাষাতেই গাইতে আসবে কলকাতাতে”
মাতৃভাষা প্রতিটি মানুষের আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের প্রথম মাধ্যম, তার অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের গভীরতম ভিত্তি। বিশ্বের ইতিহাসের দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নানা টানাপোড়েনের ফলে বহু সময়েই মানুষ তার মাতৃভাষা চর্চার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাই এই বঞ্চনার ইতিহাস যেমন দীর্ঘ, তেমনি তার সমান্তরালে রচিত হয়েছে প্রতিবাদের ইতিহাস, স্পর্ধার ইতিহাস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃপ্তভাবে রুখে দাঁড়ানোর ইতিহাস। এই সংগ্রামের এক উজ্জ্বল অধ্যায় হল উনিশে মে, যা বরাকবাসী তথা সমগ্র বাঙালি সমাজের চিন্তন ও মননে আজও গভীরভাবে প্রোথিত।
‘বঙ্গভূমিকা’ গ্রন্থের সূচনায় সুকুমার সেন যে গভীর সত্য উচ্চারণ করেছিলেন, “ভাষা নিয়ে জাতি, জাতি নিয়ে দেশ”, তার মধ্যেই নিহিত রয়েছে বাঙালির জাতিসত্তার মূল সূত্র। বাঙালি কখনও শুধুমাত্র ভৌগোলিক সীমানায় নিজেকে আবদ্ধ রাখেনি; বরং মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে গড়ে তুলেছে এক বিস্তৃত মানবিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। এই চেতনারই ধারাবাহিকতায় বৃহত্তর “বাংলা সাহিত্যের তৃতীয় ভুবন” হিসেবে পরিচিত বরাক উপত্যকায় উনিশে মে-র ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই ছিল না; তা বাঙালির আত্মমর্যাদা, সাংস্কৃতিক সত্তা ও ঐতিহাসিক চেতনাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠার এক অবিনাশী ও চিরস্মরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিল।
বরাকের বাঙালিরা, যারা এক ‘মমতাবিহীন কালস্রোতের’ শিকার, নিজেদের ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তাকে রক্ষা করার জন্য বাধ্য হয়েছিল চরম আত্মত্যাগের পথে হাঁটতে। ১৯৬১ সালের ১৯শে মে, শিলচরের মাটিতে ১১ জন বীর ভাষা শহিদের আত্মবলিদান কেবল একটি রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের ঘটনা নয়; এটি ছিল আত্মপরিচয়ের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম, যার ফলে রাজ্যভাষা আইনের সংশোধিত রূপে বরাক উপত্যকার মানুষের ভাষাগত অধিকার স্বীকৃতি লাভ করে।
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়, একটি ভাষার অধিকার রক্ষায় ঝরে পড়া রক্তের সেই গোপন আর্তনাদ কি কখনও সত্যিই শোনা যায়? সেই আর্তনাদ কি কোলাহলের ভিড়ে বিলীন হয়ে যায়, নাকি রক্তিম পলাশের মতোই জ্বলে ওঠে ইতিহাসের বুকজুড়ে? জ্যৈষ্ঠের প্রখর মধ্যদুপুরের মতোই তার তাপ আজও ছড়িয়ে আছে, এক অম্লান দাবানলের মতো, যা আমাদের স্মৃতি, চেতনা ও দায়বদ্ধতাকে অবিরাম দগ্ধ করে, প্রশ্ন তোলে, এবং নতুন করে জাগিয়ে তোলে বরাকবাসীর ভাষা ও আত্মপরিচয়ের প্রতি অটল অঙ্গীকার।
১৯৬১ সালের ১৯শে মে, শিলচর, বরাক উপত্যকার এক দুপুর। সূর্যের তাপ সে দিন ছিল প্রখর, যেন মানুষের অন্তরের জ্বালা তারই প্রতিফলন, রক্তে, অশ্রুতে, আর এক অভূতপূর্ব সাহসের দীপ্ত আগুনে। শিলচরের আকাশে তখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল গুলির শব্দ; প্রতিটি শব্দ যেন প্রতিবাদের একেকটি অক্ষর। মৃত্যুকে অতিক্রম করে রচিত হচ্ছিল ইতিহাসের এক অনন্ত অধ্যায়।
দুপুরটি যেন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল; সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল এক অনিবার্য মুহূর্তে। বাতাস বইছিল ঠিকই, কিন্তু তার ভাঁজে ভাঁজে মিশে ছিল এক অদৃশ্য আতঙ্ক, এক অপ্রকাশিত বেদনার ভার। সেদিন সাধারণ মানুষ প্রতিবাদের মিছিলে সামিল হয়েছিলেন, হয়তো জানতেন, আর ঘরে ফেরা নাও হতে পারে; তবুও নির্ভয়ে, দৃপ্ত কণ্ঠে, বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় শক্তির নির্মম গুলির মুখোমুখি। তাঁদের আত্মত্যাগেই লেখা হয়েছিল এক চিরস্মরণীয় অধ্যায়, যা শুধু ইতিহাস নয়, এক আবেগ। আর হৃদয়ের গভীরে গর্জে উঠেছিল এক অনিবার্য প্রশ্ন,
“আমার মাতৃভাষা কি তবে বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যাবে? আমি কি থাকব নির্বাক, নীরব, নিস্পৃহ?”
বরাকবাসী তথা সমগ্র বাঙালি সমাজের এই সত্তার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও জটিল ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভাজন এবং শ্রীহট্ট গণভোটের মতো বেদনাবহ অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে সিলেট জেলার তদানীন্তন আসাম প্রদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এ অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে এক গভীর ছাপ ফেলে। দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে পূর্ববঙ্গ থেকে আগত বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তু বাংলা ভাষাভাষী মানুষ আসামে আশ্রয় গ্রহণ করেন। আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই তাঁরা অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা বঞ্চনার সম্মুখীন হতে থাকেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ভাষাকে কেন্দ্র করে উপনিবেশ-উত্তর ভারতে ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া তৎকালীন আসামে ভাষা সমস্যাকে আরও জটিল ও তীব্র করে তোলে।
স্বাধীনতার পরপরই আসাম সরকারের একাংশ এবং অসমীয়া সমাজের মধ্যে উগ্র আঞ্চলিকতাবোধ ও জাতীয়তাবাদের উত্থান বাঙালিদের প্রতি এক বৈরী মনোভাব সৃষ্টি করে। একটি ভ্রান্ত ধারণা দৃঢ় হয়ে ওঠে যে, বাঙালিরাই নাকি অসমের অগ্রগতির অন্তরায়। এই মানসিকতার ফলস্বরূপ রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা এবং বহুভাষিক সংস্কৃতির অস্তিত্ব রক্ষার দ্বন্দ্বে ভাষা-সংকট দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। ভাষা, শিক্ষা, চাকরি, ভূমি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্র, প্রায় সর্বত্রই বাঙালিদের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করা হয়। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা জুড়ে শুরু হয় ভাষিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, দাঙ্গা ও অস্থিরতা, যার প্রতিক্রিয়া এসে আঘাত হানে বরাক উপত্যকার বাঙালিদের মাতৃভাষার উপর।
এই ক্রমবর্ধমান নিপীড়ন, বঞ্চনা ও অস্তিত্বের সংকট বরাকবাসীর মধ্যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের জন্ম দেয়। ধীরে ধীরে তাঁরা সংগঠিত হতে শুরু করেন, নিজেদের ভাষাগত অধিকার ও আত্মপরিচয় রক্ষার লক্ষ্যে। এই জনজাগরণই একসময় প্রতিবাদী সত্তার সুস্পষ্ট রূপ ধারণ করে এবং তারই ধারাবাহিকতায় বরাক উপত্যকায় ভাষাভিত্তিক গণআন্দোলনের এক প্রবল জনজোয়ার সৃষ্টি হয়, শুরু হয় প্রতিবাদ।
উল্লেখযোগ্য, ১৯৪৭ সালের ২৫ নভেম্বর, বরাক উপত্যকার শিলচরের নর্মাল স্কুল প্রাঙ্গণে ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট ভাষাবিদ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী অধ্যাপক এবং বঙ্গীয় বিধান পরিষদের তৎকালীন সভাপতি ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়।
সম্মেলনে সেদিন হাজার হাজার নারী-পুরুষে ছিল পূর্ণ। সেদিন ড. চট্টোপাধ্যায় তাঁর বক্তব্যে আসামের বহুভাষিক বাস্তবতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং যুক্তি প্রদান করেন যে, প্রদেশে বাংলা ও অসমীয়া, উভয় ভাষাই গুরুত্বপূর্ণ জনসমষ্টির ভাষা হওয়ায়, এক ভাষার দ্বারা অপর ভাষার ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াস ন্যায়সঙ্গত নয়। তাঁর মূল অভিমত ছিল ভাষাগত বহুত্ববাদ (linguistic pluralism) এবং ন্যায্য ভাষিক অধিকার রক্ষার পক্ষে। এই সম্মেলনটি বরাক উপত্যকার ভাষা-আন্দোলনের প্রাথমিক চেতনা নির্মাণে এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।
১৯৬০ সালে অসম সরকার ঘোষণা করে যে অসমীয়া ভাষাকে একমাত্র রাজ্যভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এই ঘোষণার পরই বরাক উপত্যকার বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে শুরু হয় গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগ। সেই সময়ে বরাক উপত্যকা, শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি, তিনটি জেলাই (বর্তমানের) ছিল তৎকালীন অসমের গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা। সেখানে বহু দশক ধরে বাংলা ছিল প্রশাসনিক, শিক্ষাগত এবং সাংস্কৃতিক ভাষা। এই অঞ্চলের জনগণ চেয়েছিলেন, বাংলা ভাষাকে সেখানে স্বীকৃত আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে রক্ষা করা হোক। কিন্তু অসম সরকার এই দাবি অগ্রাহ্য করে। ফলস্বরূপ বাঙালি ও অন্যান্য পাহাড়ি জাতি-উপজাতির মানুষ সম্মিলিতভাবে সভা-সমিতি, মিছিল-মিটিং করে বিধানসভার বাইরে ও ভিতরে প্রবল প্রতিবাদ জানান। তাঁরা বহুবার আবেদন-নিবেদন করেন, দিল্লির দরবারে গিয়েও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন। কিন্তু সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। অবশেষে অবিভক্ত কাছাড় জেলার বঙ্গবাসী, মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় শুরু করেন এক তীব্র ও ঐতিহাসিক আন্দোলন। দিলীপ কান্তি লস্কর তাঁর ‘উনিশে মে’র ইতিহাস’ গ্রন্থে লেখেন,
“কাছাড়ের ঘরে ঘরে তখন বিপ্লবের দুন্দুভি বেজে উঠেছে। নববর্ষের শুভ দিনে সমগ্র কাছাড় যেন একযোগে শপথ নেয়, ‘জান দেব, জবান দেব না’। সত্যাগ্রহীরা দলে দলে পথে বেরিয়ে পড়েন পদযাত্রায়। এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে গিয়ে তাঁরা গেয়ে ওঠেন, ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা!’ তাঁরা জনতাকে আহ্বান জানান, ‘ভাইসব, মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও, কারণ লড়াইয়ের দিন এসে গেছে, অহিংস পথে লড়াই।’”
বড়থল, দেওয়ান, আয়নাখাল, সকল চা-বাগান অঞ্চল, শ্রীগৌরী, মাছলি, কায়স্থগ্রাম, উধারবন্দ, বদরপুর, হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ থেকে শিলচর, সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। গোটা কাছাড় যেন এক বর্ণময় সংগ্রামের অভিঘাতে জ্বলে ওঠে। কিন্তু অবস্থার কোনো পরিবর্তন হল না। বাঙালিদের ওপর চাপ-প্রয়োগ অব্যাহত রইল।
অতঃপর, অসমীয়াদের তীব্র বাঙালি-বিদ্বেষের প্রতিবাদে বরাক উপত্যকায় ছড়িয়ে পড়ে গণ-আন্দোলনের ঝড়। ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় ‘কাছাড় গণসংগ্রাম কমিটি’, যা বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলনকে নতুন গতি ও দিশা দেয়। এই দাবিকে কেন্দ্র করে ১৪ এপ্রিল বরাক উপত্যকার বর্তমান তিন জেলায়, কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে, উদযাপিত হয় ‘সংকল্প দিবস’। আন্দোলনের তীব্রতা যত বাড়তে থাকে, আসাম সরকারের দমন-পীড়নও ততই ভয়াবহ রূপ নিতে শুরু করে। পুলিশের পাশাপাশি আধা-সেনা নামিয়ে আন্দোলন দমন করতে তৎপর হয় প্রশাসন।
১৯৬১ সালের ১৯ মে’র গণঅভ্যুত্থানের প্রাক্কালে বরাক উপত্যকার প্রতিটি অঞ্চলে সংগ্রাম পরিষদের শাখায় অসংখ্য সত্যাগ্রহী নাম লেখান। ১৩ এপ্রিল গণসংগ্রাম কমিটি থেকে ১৯ মে ১২ ঘণ্টার হরতালের ডাক দেওয়া হয়। ঘোষিত হয় জেলা জুড়ে অহিংস সত্যাগ্রহ, হরতাল ও পিকেটিংয়ের কর্মসূচি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সরকারও সারা জেলায় মোতায়েন করে বন্দুকধারী বাহিনী; নিরাপত্তা বাহিনীতে ছেয়ে যায় বরাক উপত্যকা। ১২ মে থেকেই সেনা কমান্ডে পরিচালিত আসাম রাইফেলস জওয়ানেরা শুরু করেন ফ্ল্যাগ মার্চ। ১৮ মে গ্রেফতার হন ভাষা আন্দোলনের প্রথম সারির নেতারা, কিন্তু আত্মগোপনে থেকে আন্দোলন চালিয়ে যান অন্যরা।
ইতিহাস বলে, ভাষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অনেকেই জড়িত ছিলেন। শোনা যায়, সংগ্রামের প্রস্তুতির জন্য যখন চাঁদা তোলা হয়, তখন বাজারের ভিতরে একটি মেয়ে দোকানি দুই আনা পয়সা দিয়ে বলেছিলেন, “বাবা, আমাদের ভাষা আসবে তো?” এই দোকানির হয়তো সারাদিনে উপার্জন হবে আট আনা। সেখান থেকে সে দুই আনা দিয়ে দিলো।
১৯৬১ সালের ১৯শে মে, সকাল ছ’টা থেকেই সত্যাগ্রহীরা অহিংসভাবে হরতাল পালন শুরু করেছিলেন। শিলচরের তারাপুর রেলস্টেশনে গণঅনশন ও প্রতিবাদে সামিল হন হাজার হাজার মানুষ। তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে দাবি করছিলেন বাংলা ভাষার সাংবিধানিক মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার। কিন্তু তাঁদের সেই দাবি প্রত্যাহার করার জন্য সেনাবাহিনী লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ইত্যাদি নিয়ে প্রতিবাদীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। নির্যাতনের মুখেও রেললাইন ছাড়েন না আন্দোলনকারীরা। করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতেও ঘটে একই ঘটনা। তিন জেলাতেই পিকেটারদের গ্রেফতার করে পুলিশ। কিন্তু হাজার হাজার মানুষ পুলিশের দমন-পীড়নকে উপেক্ষা করে আন্দোলন চালিয়ে যান।
জেল উপচে পড়ে, গ্রামে ফেলে আসা সত্যাগ্রহীদের সংগ্রাম পরিষদের গাড়ি আবার ফিরিয়ে আনে। মনে হয় আন্দোলন সফল; কিন্তু হঠাৎ ভারতীয় সময় বেলা ২টা ৩৫ মিনিট নাগাদ শিলচর তারাপুর রেলস্টেশনে অহিংস সত্যাগ্রহীদের উপর নিরাপত্তারক্ষীরা ১৭ রাউন্ড গুলি চালায়। রক্তে ভিজে যায় স্টেশন চত্বর। ঘটনাস্থলেই নয়জন লুটিয়ে পড়েন; পরবর্তীতে মোট ১১ জন শহিদ হন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন স্কুলশিক্ষক, গৃহবধূ, ছাত্র, দোকানদার ও নানা পেশার সাধারণ মানুষ, যাঁরা সবাই ভাষার দাবিতে প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন। এ ছিল স্বাধীন ভারতে ভাষার দাবিতে প্রথম বড় রক্তপাত।
সেদিন কারো আঁচলে ছিল দুধের গন্ধ, কারো মুঠোয় বাবার শেষ চিঠি, তবু তাঁরা দাঁড়িয়েছিলেন ইতিহাসের মুখোমুখি। আজও বাংলায় লিখতে গিয়ে কাঁপে কলম, রক্তে ভেজে কাগজ। ১৯শে মে বলে ওঠে, “বাঁচো, মাতৃভাষায় বাঁচো।”
১৯৫২-এর পর ১৯৬১, মাতৃভাষা বাংলার জন্য প্রাণ দিলেন বাঙালি। সেদিন শহিদ হয়েছিলেন ‘অমর একাদশ’, কমলা ভট্টাচার্য, কুমুদ রঞ্জন দাস, সুকমল পুরকায়স্থ, হিতেশ বিশ্বাস, বীরেন্দ্র সূত্রধর, তরণী দেবনাথ, কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, সুনীল সরকার, শচীন্দ্র চন্দ্র পাল ও সত্যেন্দ্র দেব। আহত হন শত শত ভাষাপ্রেমী মানুষ। শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে শিলচর তথা বরাক উপত্যকা এবং সমগ্র আসাম।
কিন্তু মৃত্যুও ভাঙতে পারেনি বরাকের মানুষের মনোবল। শহিদদের আত্মবলিদান যেন নতুন প্রেরণা হয়ে কাছাড়ে চলতে থাকে লাগাতার আন্দোলন। দিনের পর দিন কোর্ট-কাছারি, অফিস-আদালত দখল করে বসে থাকে জনতা।
১৯শে মে’র রক্তাক্ত দিন শুধু বরাকেই নয়, কাঁপিয়ে দেয় শিলঙের রাজপথও। খাসি ও বাঙালির মিলিত মিছিল যেন হয়ে ওঠে এক বর্ণাঢ্য প্রতিবাদের পটভূমি। কলকাতার পথেও ধ্বনিত হয় বরাকের আর্তনাদ।
অবশেষে গণচেতনার উত্তাল ঢেউ ছিন্ন করে প্রশাসনিক নির্লিপ্ততার বাঁধ। আসাম বিধানসভায় পাস হয় সংশোধিত ভাষা আইন, যেন শহিদদের আত্মত্যাগের প্রতিধ্বনি। অবিভক্ত কাছাড়ে বাংলা পায় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, আর আসামের ভাষাচিত্রে আঁকা হয় দ্বৈতরূপ, ব্রহ্মপুত্রে অসমীয়া, বরাকে বাংলা, সেতুভাষা ইংরেজি। ১৯শে মে তাই শুধু বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনের দিন নয়, এটি হয়ে উঠেছে ভারতের ভাষাবৈচিত্র্যের সংগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক।
বাঙালির আত্মপরিচয়ের গৌরব, তার জাতীয় সত্তা যে এক অখণ্ড, অবিভাজ্য সত্তা; তার সাংস্কৃতিক রূপকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু তাঁরই ‘আফ্রিকা’ কবিতার মর্মন্তুদ অনুরণনের মতো বরাক উপত্যকার ইতিহাসেও প্রতিধ্বনিত হয়েছে এক দীর্ঘস্থায়ী “ভাষাহীন ক্রন্দন”, যেখানে শহিদদের রক্তে কলুষিত হয়েছে মাটি, অপমানিত হয়েছে ইতিহাসের মানবিকতা। ১৮৭৪-এ বাণিজ্যিক স্বার্থে অখণ্ড বঙ্গের ভূগোল থেকে বিচ্ছিন্ন করে যেদিন শ্রীহট্টকে আসামের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হল, সেদিন থেকেই ‘নির্বাসিতা সুন্দরী শ্রীভূমির’ অধিবাসীরা হয়ে গেল ব্রাত্যজন। শ্রীশ্রীচৈতন্য, শ্রীঅদ্বৈত কিংবা হজরত শাহজালালের ঐতিহ্যে গড়ে ওঠা ভাষা-সংস্কৃতির উত্তরসূরিরা সেই থেকেই এক প্রান্তিকতার ইতিহাসে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। তবুও, এই বিচ্ছিন্নতার ভেতর থেকেই জন্ম নেয় ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার এক অদম্য জাগরণ; যার চূড়ান্ত রূপ আমরা প্রত্যক্ষ করি ১৯৬১ সালের ১৯শে মে-র আত্মবলিদানে।
রবীন্দ্র-জন্মশতবর্ষে যখন সমগ্র বাংলা ও বিশ্বভুবন কবিকে শ্রদ্ধার্ঘ্যে নত, তখন বরাক উপত্যকার বাঙালিরা রক্তের অর্ঘ্যেই অঞ্জলি নিবেদন করেছিল; এ এক ইতিহাসের নির্মম কিন্তু মহিমান্বিত সমাপতন। বাহান্নর ঢাকার ভাষা আন্দোলনের প্রেরণা, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের সহমর্মিতা এবং পদ্মা-মেঘনা-যমুনার স্রোতের সঙ্গে কুশিয়ারা-ধলেশ্বরী-সুরমার সেতুবন্ধন, সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে এক অখণ্ড চেতনার সংগম, যেখানে বুড়িগঙ্গা ও বরাক একই আত্মপরিচয়ের ধারায় মিলিত হয়। তবুও প্রশ্ন আজও রয়ে যায়, বরাকের ভাষা কি বাংলা, তার মানুষ কি বাঙালি? এই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তিই প্রমাণ করে, ইতিহাসের ক্ষত এখনো সম্পূর্ণ শুকায়নি।
তবুও, “অজস্র মৃত্যুরে পার হয়ে” যে নবপ্রভাতের স্বপ্ন উচ্চারিত হয়েছিল, ১৯শে মে তারই দীপ্ত বাস্তবতা। শিলচরের রক্তাক্ত দুপুর আমাদের শেখায়, মাতৃভাষা কেবল দাবি নয়, এটি অস্তিত্বের অধিকার।
বরাকের সেই আত্মবলিদান আজও অনির্বাণ শিখার মতো জ্বলে, স্মরণ করায়, ভাষা রক্ষার সংগ্রাম মানেই আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম। ১৯শে মে অতীতকে স্মরণ করিয়ে বর্তমানকে প্রশ্ন করে এবং ভবিষ্যতের পথকে আলোকিত করে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন