নববর্ষ বাঙালির জীবনে এক অনন্য উৎসব। পুরাতনকে বিদায় দিয়ে নতুনকে স্বাগত জানানো। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দিনযাপনেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। সেকালের নববর্ষ ছিল গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত, আর এখন নববর্ষ মননে ও যাপনে আধুনিক ও বাহ্যিক আড়ম্বরপূর্ণ। সামাজিক মাধ্যম, হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদির প্রভাবে নববর্ষ উদযাপন হয়ে উঠেছে বহুমাত্রিক।
অনেকে মনে করেন সপ্তম শতকে রাজা শশাঙ্কের আমলে বাংলা সনের সূত্রপাত। কারো মতে, ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবর রাজস্ব আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের উদ্দেশ্যে বাংলা সন প্রবর্তন করেন। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন। পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। বাংলা সনের মূল নাম ছিল তারিখ-এ-এলাহী। তারিখ-এ-এলাহীতে বাংলা মাসের যে নাম ছিল, কখন এবং কোন সময় তা পরিবর্তিত হয়ে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ হলো, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। ধারণা করা হয়, ১২টি নক্ষত্রের নাম নিয়ে বাংলা মাসের নামকরণ করা হয়।
আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে পহেলা বৈশাখে হোম, কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। তারপর ১৯৩৮ সালেও এ ধরনের আনুষ্ঠানিকতার উল্লেখ পাওয়া যায়। তথ্য বলে, জমিদারী খাজনার হিসাব-নিকাশ হতো চৈত্র সংক্রান্তির দিনে। সে অনুযায়ী বৈশাখের প্রথম দিনে নতুন খাতায় সেই হিসাব তোলা হতো এবং প্রজাদের মিষ্টিমুখ করানো হতো। পরবর্তীতে এই হালখাতা সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে।
আমার শৈশব-কৈশোর-যৌবন কেটেছে শহর শিলচরে। আজ প্রৌঢ়ত্বে উপনীত হয়ে মনে পড়ছে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। আমাদের কাছে চৈত্র মাসের শেষ দুটো দিন ‘হাড়িবিষু’ ও ‘মহাবিষু’ নামে পরিচিত ছিল। হাড়িবিষু বলা হতো, কারণ এই দিনে ব্রহ্মা পোকামাকড় হাড়িতে ঢাকা দিয়ে রেখে দিতেন। বিশ্বাস ছিল, মেঘ ডাকলে সেই পোকাগুলি মারা যাবে, তাতে করে পরের বছর পোকার উপদ্রব থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।
আর মহাবিষু হলো চৈত্র মাসের শেষে, যখন সূর্য মীন রাশি থেকে মেষ রাশিতে প্রবেশ করে, তখন দিন ও রাত্রি সমান হয়। এই সময় সূর্য নিরক্ষরেখার উপর অবস্থান করে বলে এই দিনটিকে মহাবিষু বা মহাবিষুব সংক্রান্তি বলা হয়। হাড়িবিষুতে নিমপাতা, হলুদ ও তেলের মিশ্রণ শরীরে লাগানো হতো, কারণ এ মিশ্রণ ছিল বসন্ত রোগমুক্তির প্রতিষেধক। মহাবিষুতে তেল, সাবান নিষিদ্ধ। সর্বৌষধি জল দিয়ে স্নানের পাশাপাশি কাঁচা দুধে মুসুরির ডাল ও নিমপাতা ভিজিয়ে খাওয়ার রীতিও আছে, সর্পভয় থেকে মুক্তি কামনায়।
অম্বল, ডাল ও এঁচোড়ের সবজি সহযোগে নিরামিষ খাবার নিয়ম ছিল। চৈত্র সংক্রান্তির দিনে গ্রামেগঞ্জে বাড়ির আনাচে-কানাচে, পথে-ঘাটে যেসব শাক জন্ম নেয়, সে রকম ১৪ শাক ও আটকড়ই (ছোলা, ভুট্টা, সীমবীচি, বাদাম, মটর, খেসারি, বিউলি, মুগ) শুকনো খোলায় ভেজে খাওয়ার প্রচলন ছিল কারো কারো মধ্যে। এছাড়া চৈত্র সংক্রান্তিতে লোকাচারমূলক অনুষ্ঠান, যেমন চড়ক পূজা, সংক্রান্তির মেলা, সেকালেও ছিল, আজও আছে।
শ্মশানে আধপোড়া জ্বলন্ত কাঠের উপরে কালী নৃত্য, আর মহাবিষুর দিনে চড়ক পূজার মধ্য দিয়ে গাজন উৎসবের সমাপ্তি। মূলত কার্তিক সংক্রান্তিতে যে অনুষ্ঠান হতো, তাই ছিল বর্ষবরণের অনুষ্ঠান—‘ভুলা চাড় ভুলি চাড়, বারমাইয়া পিছাইয়া চাড়’; পরে তা চৈত্র সংক্রান্তিতে পরিবর্তিত হয়।
মনে পড়ে, আমাদের ছোটবেলায় নববর্ষের বিকেলে বিভিন্ন দোকানের আমন্ত্রণে যোগদান করা বিশেষ আনন্দের ছিল। ঠান্ডা পানীয়, মিষ্টি, ক্যালেন্ডার হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসতাম আমরা। কোনোদিনই কোনো দোকানে মা বা বাবার বকেয়া ছিল বলে মনে পড়ে না। আমি যতটুকু বুঝেছিলাম, এই আমন্ত্রণ বা আয়োজনের পেছনে ছিল বকেয়া আদায়।
ব্যবসায়ীরা গণেশ মূর্তির সামনে নতুন হালখাতা নিয়ে বসে থাকতেন। থালায় আমন্ত্রিত ক্রেতার দক্ষিণা তার নামের বিপরীতে লিখে রাখা হতো। তাই বলে বকেয়াবিহীন ক্রেতাদেরও সাদর আমন্ত্রণে ত্রুটি ছিল না। তাদের মধ্যে কারো দক্ষিণা আগাম জমা হিসেবে বিবেচিত হতো। পরবর্তী সময়ে তাদের কেনা সামগ্রীর মূল্য থেকে তা ছাড় দেওয়া হতো।
আজকে নববর্ষে সংস্কার যেমন নেই, নেই সেই আমন্ত্রণ, নেই কোনো উৎসাহ-আনন্দ। আজ সবাই যন্ত্রচালিত। চোখাচোখি নয়, হাতে হাত রেখে নয়, ব্যবসার সঙ্গে সঙ্গে মানুষও আজ যন্ত্রের উপর ভর করেই বেঁচে আছে। জীবনযাত্রার ইঁদুর দৌড়ে মানুষ আজ ধ্বস্ত, ক্লান্ত। নেই কোনো ভালোবাসা, নেই কোনো ভালো লাগা। আছে শুধু দেওয়া আর নেওয়ার পালা—দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে প্রতিপদে, প্রতি মুহূর্তে।
তবে এত কথার পর একটা কথাই মনে হয়, একাল ও সেকালের মধ্যে বাহ্যিক পার্থক্য থাকলেও এর অন্তর্নিহিত চেতনা একই। নববর্ষ হল নতুনের আহ্বান। সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন লালনের পাশাপাশি অনিবার্য সত্য হলো, পৃথিবীতে বেঁচে থাকার মেয়াদে আরেকটি বছরের সংযোজনও বৈকি।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন