রাখীর সুতোয় ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধন

প্রতাপ : অনলাইন-৫৭

। প্রতীমরাজ ভট্টাচার্য ।

রাখীবন্ধন ভারতীয় সংস্কৃতির এক পরিচিত ও আবেগঘন উৎসব। শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত এই উৎসবকে সাধারণভাবে ভাই-বোনের ভালোবাসা, পারস্পরিক স্নেহ ও দায়িত্ববোধের উৎসব হিসেবে দেখা হয়। একটি ছোট্ট সুতো কব্জিতে বাঁধার মধ্য দিয়ে যে সম্পর্কের নবায়ন ঘটে, তার তাৎপর্য কিন্তু কেবল পারিবারিক পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাখী হয়ে উঠেছে ভালোবাসা, বিশ্বাস, দায়িত্ব, সৌহার্দ্য এবং সামাজিক সম্প্রীতিরও প্রতীক। শ্রাবণী পূর্ণিমায় রাখী বাঁধার প্রচলিত রীতি বিশেষত ভাই-বোনের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।

রাখীবন্ধনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য নিহিত রয়েছে সম্পর্কের মূল্যবোধে। মানুষের জীবনে ভাই-বোনের সম্পর্ক অত্যন্ত স্বাভাবিক অথচ গভীর একটি সম্পর্ক। শৈশবের খেলাধুলা, আনন্দ-বেদনা, মান-অভিমান, ঝগড়া এবং পরস্পরের পাশে থাকার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এই সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের ব্যস্ততা, দূরত্ব ও নানা পারিবারিক দায়িত্ব মানুষকে আলাদা করে দিলেও রাখী সেই পুরনো সম্পর্ককে নতুন করে স্মরণ করার একটি উপলক্ষ এনে দেয়। তাই রাখী কেবল কব্জিতে বাঁধা সুতো নয়; এটি স্মৃতি ও সম্পর্ককে পুনরায় স্পর্শ করার একটি প্রতীকী মুহূর্ত।

রাখীবন্ধনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পারস্পরিক দায়িত্ববোধ। প্রচলিত অর্থে বোন ভাইয়ের হাতে রাখী বাঁধে এবং ভাই বোনের পাশে থাকার অঙ্গীকার করে। তবে আধুনিক সমাজে এই সম্পর্ককে একতরফা ‘রক্ষা করার’ ধারণায় সীমাবদ্ধ না রেখে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্মানের সম্পর্ক হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিযুক্ত। ভাই যেমন বোনের পাশে থাকবে, তেমনি বোনও ভাইয়ের সুখ-দুঃখে পাশে থাকবে—এই পারস্পরিকতার মধ্যেই সম্পর্কের প্রকৃত সৌন্দর্য। কারণ ভালোবাসার সম্পর্ক কখনও একতরফা দায়িত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।

তৃতীয়ত, রাখীবন্ধন পরিবারের বন্ধনকে দৃঢ় করার একটি সামাজিক উপলক্ষ। বর্তমান সময়ে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও নানা কারণে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন শহর বা দেশে বসবাস করেন। ফলে প্রতিদিনের দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ অনেক কমে গেছে। রাখী সেই দূরত্ব অতিক্রম করে আত্মীয়তার বন্ধনকে স্মরণ করার সুযোগ দেয়। দূরে থাকা ভাই-বোনও এই দিনে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, শুভেচ্ছা জানান এবং সম্পর্কের উষ্ণতা অনুভব করেন। এই দিক থেকে রাখী পারিবারিক সম্পর্ককে পুনরুজ্জীবিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উৎসব।

রাখীবন্ধনের আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো নারীর সম্মান ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। ঐতিহ্যগতভাবে রাখীর সঙ্গে ভাইয়ের দ্বারা বোনকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতির ধারণা যুক্ত হয়েছে। কিন্তু আজকের সমাজে ‘রক্ষা’ শব্দটির অর্থ নতুনভাবে ভাবা দরকার। একজন নারীকে কেবল পুরুষের সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল করে রাখাই এই উৎসবের উদ্দেশ্য হতে পারে না। বরং নারীর স্বাধীনতা, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাখীর আধুনিক অঙ্গীকার। তাই রাখীর সুতো যেন কেবল বোনকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি না হয়ে নারীকে সম্মান করার সামাজিক শপথ হয়ে ওঠে।

রাখীবন্ধনের গুরুত্ব পারিবারিক সীমা অতিক্রম করে সামাজিক সম্প্রীতির ক্ষেত্রেও বিশেষভাবে স্মরণীয়। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উদাহরণ ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন। বঙ্গভঙ্গের সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখীবন্ধনের প্রতীককে ব্যবহার করে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতির আহ্বান জানিয়েছিলেন। সে সময় রাখী ভাই-বোনের সম্পর্কের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের পারস্পরিক সংহতির প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

এই ঘটনাটি রাখীবন্ধনের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এখানে একটি পারিবারিক আচার বৃহত্তর সামাজিক চেতনার বাহন হয়ে উঠেছিল। ধর্মের বিভাজনের পরিবর্তে মানুষে মানুষে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার যে বার্তা রবীন্দ্রনাথ দিয়েছিলেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর সেই ভাবনায় রাখী ছিল বিভেদের বিরুদ্ধে ঐক্যের প্রতীক। তাই রাখীবন্ধনের তাৎপর্য শুধু আবেগে নয়, সামাজিক চেতনার মধ্যেও নিহিত।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সম্প্রীতি ও মানবিকতার শিক্ষা। ভারত বহু ভাষা, ধর্ম, জাতি ও সংস্কৃতির দেশ। এই বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য রক্ষা করা আমাদের অন্যতম সামাজিক দায়িত্ব। রাখীর মূল ভাব—বন্ধন—এই ঐক্যের ধারণাকে শক্তিশালী করতে পারে। একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের প্রতি সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করতে পারে। সেই অর্থে রাখীকে কেবল নির্দিষ্ট একটি সম্পর্কের উৎসব হিসেবে না দেখে মানবিক বন্ধনের প্রতীক হিসেবেও ভাবা যায়।

তবে উৎসবের সঙ্গে বাজারের অতিরিক্ত জাঁকজমক যুক্ত হওয়াও বর্তমান সময়ের একটি বাস্তবতা। নানা ধরনের দামী রাখী, উপহার এবং বাহ্যিক আয়োজন উৎসবের অংশ হয়ে উঠেছে। উপহার দেওয়া বা উৎসবের আনন্দ উপভোগ করার মধ্যে দোষ নেই, কিন্তু তা যেন রাখীর মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল না করে। একটি সাধারণ সুতোও যে গভীর ভালোবাসা ও আন্তরিকতার বাহক হতে পারে, সেটিই এই উৎসবের আসল শিক্ষা।

রাখীবন্ধন তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে বড় আয়োজনের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন আন্তরিকতা, সম্মান ও পাশে থাকার মানসিকতা। ভাই-বোনের সম্পর্কের মধ্যে যেমন ভালোবাসা থাকা দরকার, তেমনি থাকা দরকার পরস্পরের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান। পরিবারে মতের অমিল থাকতেই পারে, কিন্তু সেই অমিল যেন সম্পর্কের উষ্ণতাকে নষ্ট না করে।

সবশেষে বলা যায়, রাখীবন্ধনের গুরুত্ব তার বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানে নয়, তার অন্তর্নিহিত বন্ধনের দর্শনে। এই উৎসব আমাদের শেখায়—সম্পর্ককে অবহেলা নয়, যত্ন করতে হয়; ভালোবাসাকে শুধু মুখের কথায় নয়, কাজে প্রকাশ করতে হয়; আর মানুষের মধ্যে বিভেদ নয়, সম্প্রীতির সেতু নির্মাণ করতে হয়। ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ যে রাখীকে সামাজিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, সেই ঐতিহাসিক স্মৃতি আজও আমাদের নতুন করে ভাবায়।

আজ যখন সমাজে নানা কারণে দূরত্ব ও বিভাজন তৈরি হয়, তখন রাখীর সুতো আমাদের কাছে একটি সহজ অথচ শক্তিশালী বার্তা বহন করতে পারে—বন্ধন মানে শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়; বন্ধন মানে বিশ্বাস, সম্মান, দায়িত্ব, সহমর্মিতা এবং মানুষে মানুষে ভালোবাসা। তাই রাখীবন্ধন কেবল ভাইয়ের হাতে বোনের রাখী বাঁধার দিন নয়; এটি সম্পর্ককে মর্যাদা দেওয়ার, বিভেদ ভুলে কাছে আসার এবং মানবিকতার বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই সপ্তাহের জনপ্রিয় পোষ্ট

আকর্ষণীয় পোষ্ট

প্রতাপ এর কথা

।। মঞ্জরী হীরামণি রায় ।। শৈলেন দাস বরাক উপত্যকার সাহিত্য চর্চায় এক পরিচিত নাম। শৈলেনের কবিতা আমি প্রথম ওঁর কন্ঠেই পাঠ শুনেছিলাম শনবিলে একটি...