এই নৈবেদ্যের রঙ লাল

প্রতাপ : অনলাইন-৫৩

। অপর্ণা দেব ।

ভোরবেলা ওঠা তাঁর বরাবরের অভ্যাস। উঠে ব্যালকনিতে প্রতিদিন ধীরে ধীরে পায়চারি করবেন এবং সামনে দাঁড়িয়ে চোখ রাখবেন খোলা আকাশে। এই টুকরো আকাশ একান্ত তাঁর নিজের। যতদূর দৃষ্টি যায়, চোখ মেলে ধরবেন, কথা বলবেন সামনের গাছপালার সাথে।

বাড়ির সামনেই একটি ছোট পার্ক। সেখানে রয়েছে প্রচুর গাছপালার সারি। চলাফেরা যখন সহজ ছিল, শৈবাল সকাল সকাল চলে যেতেন সেখানে। খানিকটা হেঁটে আসতেন বন্ধু কমলেশ। প্রতিদিনের দেখা, কিন্তু প্রাণবন্ত মানুষটি হেঁটে সামনে এগিয়ে আসতে আসতে তাঁকে দেখেই বলে উঠতেন, “কী খবর, শৈবাল? কখন এলে?” গাড়ি পার্ক করে ধীরলয়ে হেঁটে আসত কর্মজীবনের সাথী হৃষিকেশ, মুখে প্রশান্তির হাসি। সে বরাবরই শান্ত প্রকৃতির। সকালের পুরো সময়টা জুড়ে চলত জমিয়ে আড্ডা। ফেরার পথে গাছের ছায়ায় পায়ে পায়ে এগিয়ে চলা, কেননা এখানেই রয়েছে প্রিয় ও প্রাণের ফুল কৃষ্ণচূড়া গাছের সারি। এপাশটা তাঁদের সবারই খুব পছন্দের।

গতকাল শীত শেষে দীর্ঘ সময়ের বিরতির পর যখন চৈত্রঝড় নামল, আর ঝড় শেষে প্রবল বর্ষণ হলো, তিনি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে মগ্ন হয়ে দেখেছেন প্রতিটা মুহূর্ত, বৃষ্টির প্রতিটি জলবিন্দু। ধারাবৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে প্রতিটা গাছ, প্রাণের কৃষ্ণচূড়া বৃক্ষের সারি। খরার মরসুম শেষে এবার সবুজ হবে তাঁর পৃথিবী।

চৈত্রের শুরুতেই কমলেশ খবর নিয়েছিল, সবুজের সমারোহ প্রকৃতিকে সাজিয়েছে কিনা! সে এই শহরে নেই, তবে মন রয়ে গেছে এখানে। ধীরে ধীরে যখন চলাফেরায় দোলাচল আসছিল, প্রতিদিন সকালে আর পার্কে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। এভাবেই খবর নেওয়া হতো, চেনা ছবিগুলো দেখা যাচ্ছে কিনা। বাড়ির সামনে পার্কটি থাকায় শৈবাল মনের তৃপ্তিটুকু খুঁজে পেতেন। প্রকৃতির বদল দেখতেন। তাই কমলেশ খবর নেওয়ার আগে শৈবাল নিজেও খুব মন দিয়ে জরিপ করেছেন।

হ্যাঁ, রঙ বদল হয়েছে গাছের পাতার, এবং আরও ঘন হয়ে একে অপরের মায়াময় আদর নিচ্ছে। খুব শিগগিরই কমলেশকে নতুন সবুজ পৃথিবীর খবর জানাতে পারবেন।

ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে শৈবাল সবুজে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিয়েছেন। গতকাল থেকে খুব ডিসটার্ব তিনি। সীমান্তে যুদ্ধের দামামা বেজেছে, পরিস্থিতি কোনদিকে যাচ্ছে, বোঝা মুশকিল। শেষ বয়সে তাহলে এই অশান্তি দেখাও বাকি ছিল। যুদ্ধ মানে তো শুধু সীমান্তে নয়, এর সাথে চলে প্রতিটি মানুষের মনের সাথে যুদ্ধ। পাশের বাড়ির পলাশের সাথে কথা হচ্ছিল। সে জানাল, অনেকেই বাড়িতে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মজুত করছে। যুদ্ধের হাওয়া বাড়বাড়ন্ত হলে দৈনন্দিন জীবনেও যে তার প্রভাব পড়বে।

এই পরিস্থিতিতে হৃষিকেশের কথা খুব মনে পড়ছিল। চিরকালের শান্ত প্রকৃতির মানুষটা খুব নীরব থাকলেও প্রাণবন্ত থাকত তাঁর উপস্থিতি। বছর গড়িয়ে এল। আকস্মিকভাবে সে সবাইকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। কত কথা বলা হলো না, হৃষিকেশ! বাকি রয়ে গেল রে। এজন্মে তো আর তোকে পাব না। সে খুব সচেতন থাকত বিশ্বের সবধরনের খবর নিয়ে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা বলত, ইউক্রেনের যুদ্ধ নিয়ে তাঁর খুব মন খারাপ হতো। কতদিনের আর জীবন, এই নিয়েও আবার হানাহানি! তবে হ্যাঁ, সে এখন সবকিছুর বাইরে। তাঁর মনে পড়ছে, একবার দুজনে মিলে কৃষ্ণচূড়ার খোঁজে বেরিয়ে প্রথম ফুল ফোটা দেখার জন্য হেঁটে চলে গিয়েছিলেন বহুদূর। কমলেশ এই ঘটনার কথা শুনে স্মিত হেসে বলেছিল, “একেই বলে প্রেম।”

প্রেম কি শুধু মানুষে মানুষেই সীমাবদ্ধ থাকে!

সকালে মৃদু হাওয়ায় বসে কাগজ পড়ছেন শৈবাল। দৈনিক কাগজের ইন্টারেস্ট আজকাল হারিয়ে ফেলছেন। একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খবরে প্রকাশ, এই তো পরিস্থিতি। কাগজটা রেখে উঠে দাঁড়ালেন। আজকাল সাপোর্ট ছাড়া বসা বা উঠে দাঁড়ানো বেশ সময়সাপেক্ষ। সামনে চোখ মেলে ধরলেন। ঘন সবুজ আর কচিপাতা সবুজের সমারোহ নিপুণভাবে সাজিয়ে তুলেছে বৃক্ষসারি। থোকা থোকা কৃষ্ণচূড়ায় ঢেকে যাবে চারপাশ। এদিকের সবগুলো গাছের কৃষ্ণচূড়ার রঙ লাল। ঝরা ফুল নিচে ছড়ালে লাল গালিচা বিছানো হয়ে যায়।

কিন্তু! আশ্চর্য! কী হলো এবার! চকিতে মনে হলো শৈবালের, মাস তো চলে গেল, কিন্তু কৃষ্ণচূড়ার দেখা নেই! এরপর ঝড়-বৃষ্টি বেশি হলে সব ধুয়েমুছে যাবে। মনে একটা অশান্তি টের পেলেন। এবার কি তাহলে মরসুমি ফুল কম হবে? বলা হয়, যুদ্ধ তো সবকিছুতেই প্রভাব ফেলে। তাহলে তো সময় পেরিয়ে যাওয়ার কারণ একটাই! মন সত্যিই অশান্ত হয়ে উঠল!

প্রায় সপ্তাহ পর বাইরে এসে বসলেন শৈবাল। কদিন টানা জ্বর নিয়ে খুব ভুগতে হয়েছে, ফলে শারীরিক দুর্বলতা রয়েছে। অসুস্থতাজনিত কারণে কদিন ধরে যোগাযোগ নেই প্রায় কারও সাথেই। বিছানায় থেকে থেকে দমবন্ধ হয়ে আসছিল। খোলা হাওয়ায় বাইরে না এসে তাঁর আর ভালো লাগছিল না। দুর্বল শরীরে বাইরে এসে হাঁপ ধরে গেছে তাঁর। চোখ বুজে একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য তৈরি হতেই সামনে চোখ পড়ল... কৃষ্ণচূড়া!

ব্যালকনির ঠিক ডানদিক ঘেঁষে ঘন সবুজ পাতাঘেরা একটি জায়গায় একথোকা লাল রঙের নৈবেদ্য সাজানো। একথোকা কৃষ্ণচূড়া ফুটে রয়েছে। আহা, আনন্দ! আনন্দ!!

গতকাল রাতে তিনি খবরে শুনেছেন, সীমান্তে ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই সপ্তাহের জনপ্রিয় পোষ্ট

আকর্ষণীয় পোষ্ট

“প্রতাপ” কেবল একটি সাহিত্যপত্রিকা নয়, বরং একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রয়াস

। মেঘমালা দে মহন্ত । প্রতাপ’-এর উনিশতম মুদ্রিত সংখ্যা শুধু একটি সাহিত্যপত্রিকার নতুন প্রকাশ নয়, বরং বরাকের সাহিত্য-সংস্কৃতি, ভাষাচেতনা এবং স...