। ড. কাত্যায়নী দত্ত চৌধুরী ।
আমি একজন মাস্টারমশাই। আমার প্রধান কাজ শিক্ষকতা। আমি আমার পেশা নিজে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেছি, আর যাকে বলে “নেশাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করো”, আমার পেশাগত জীবনে এই প্রবচন একদম অক্ষরে অক্ষরে সত্য। শিক্ষক, শিক্ষা, শিক্ষা-ব্যবস্থা ও তার চারপাশে ঘিরে থাকা অগণিত ছাত্র-ছাত্রী, আমাদের যাত্রাপথটা কিন্তু সুগম নয় একেবারেই। আমাদের এক ব্যাগ সমস্যা। আমার কলমের স্বাধীনতা আছে, আমি লিখতেই পারি। পাঠকগণের কাছে মনের কথা, অনুভব, অভাব, অনুযোগ, অভিযোগ সব পৌঁছে দেওয়াতেই সার্থকতা, যদি কোনো সুরাহা বেরিয়ে আসে।
ঋতু পাল্টায়, পাল্টাতে বাধ্য, এটা প্রাকৃতিক নিয়ম। কিন্তু এই পরিবর্তনটা সময়সাপেক্ষ। পরিবর্তন আনার চেষ্টাগুলোই একরকমের ঘটনা-পরিঘটনার সমাহার, যার অংশ আমরা সবাই, সমাজ, সরকার, শিক্ষক, ছাত্র ও সর্বোপরি শিক্ষা-ব্যবস্থা।
এখন আমি আছি একটি স্বনামধন্য স্কুলের শিক্ষা-সংক্রান্ত ভারপ্রাপ্ত আসনে, যাকে অফিসিয়াল ভাষায় বলে “একাডেমিক ইনচার্জ”। একটা আস্ত স্কুলের দায়িত্ব যখন নিজেদের সামলাতে হয়, তখন আপনারা অনুকূল ও প্রতিকূল উভয় অবস্থার সম্মুখীন হবেন। শতকরা হিসেবে প্রতিকূল জটিলতার হারই বেশি।
সমস্যা শিক্ষকতা নয়, শিক্ষক নয়, ছাত্র-ছাত্রীরাও নয়, তাদের অভিভাবকরাও নয়। সমস্যা সম্পূর্ণ সিস্টেমের, বা হয়তো অন্য কোথাও, যা জানা অথচ জানা নেই।
উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোনোর পর আমি বিভিন্ন মিডিয়াতে বেশ ভাইরাল হয়ে গেলাম। তখন আমার এই অর্ধ-চেয়ারে বসার হয়তো এক সপ্তাহ (সরকারি কাগজ মতে)। অনেকে আমার কাছে ছুটে আসেন যে, এই স্কুলের রেজাল্ট খারাপ হওয়ার কারণ কী? কারণ এলাকাবাসী সকলেই কমবেশি জানেন। তাও সেই তথ্য আবার তুলে ধরছি পাঠকগণের অবগতির জন্য:
১) বিভিন্ন ক্লাসে আমাদের মোট ছাত্রসংখ্যা ৩০০ থেকে ৪০০।
২) শিক্ষক না থাকায় ও নতুন স্কুল বিল্ডিংয়ের কাজ চলার জন্য এই ৩০০-৪০০ জন একসাথে বসত, আর তাদের ক্লাস করাতেন একজন শিক্ষক।
৩) স্কুলে একটি বড় হলঘর। ক্লাস নাইন ও ক্লাস টেন একদিন পরপর স্কুলে আসত। আর করার কিছু ছিল না।
৪) পার্শ্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের কয়েকটা ক্লাসরুম যদিও নেওয়া হয়, এগুলো ছিল ক্ষণস্থায়ী ও ভঙ্গুর। তারা সকলেই আমাদের এই বিপদের সময়ে নিজেদের শত অসুবিধার মধ্যেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এই অবদান আমাদের কাছে অনস্বীকার্য। সকলের প্রতি সহানুভূতি থাকা জরুরি। এলাকাবাসী সকলেই তার সাক্ষ্য দেবেন বলে আশাবাদী।
সকলেই সায় দিলেন, যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন আপনার ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ কী?
আমি এই বিদ্যালয়ে বিগত দশ বছর ধরে কাজ করার সুবাদে অনুধাবন করতে পেরেছি, যদি আমি এই ছাত্রসংখ্যা কমিয়ে না আনতে পারি, স্কুলের উন্নতি সাধন সম্ভবপর নয়। ছাত্রসংখ্যা কমবেশি ২০০০, শিক্ষকসংখ্যা বর্তমানে ৩০। শিক্ষকসংখ্যা ৬০ হলেও সরকারের দেওয়া ৪০:১ অনুপাত মেলানো সম্ভব নয়। সমস্যা সমস্যার স্থানে, আর সমাধান সমাধানের স্থানে।
অনেকেই আমাদের কথা বুঝলেন, কঠিন পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিলেন। কিন্তু যেহেতু এই অঞ্চলের এটাই সর্ববৃহৎ শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, নতুন ছাত্রভর্তির ফরমাইশ অনেক সময় ঠেকানো সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। এখানেই ধাঁধার মজা আর মজার ধাঁধা। যে ঘট ভরে রয়েছে, তা খালি না করে কীভাবে ভরা যায়? উপচে পরবে না তো?
আসছে বছর আবার হবে! তখন যখন এমন রেজাল্ট আবারও হবে, তখন তো আমাকেই কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে, তাই তো? কনফিউজড!
২) শিক্ষকদের নামে হাজারো অভিযোগ। শিক্ষকতা ছাড়াও শিক্ষকদল এখন কী কী করছেন, বলেই ফেলি। শিক্ষকরা ট্যাব হাতে ঘুরে ঘুরে ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতি নিচ্ছেন, শিক্ষাসেতুর কাজ করছেন, ইউ-ডাইসের কাজ করছেন, বিভিন্ন সরকার-প্রদত্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত হচ্ছেন ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে, তাদের গান, নাচ, যোগা, মডেল মেকিং ইত্যাদি শিখিয়ে-পড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, ইলেকশন ডিউটি দিচ্ছেন, বি.এল.ও. ডিউটি দিচ্ছেন, পরীক্ষাও নিচ্ছেন, খাতাও দেখছেন। একটা ১০০-১২০ বা ততোধিক ছাত্রের ক্লাস শেষ করে তদ্রূপ আরেকটি ক্লাসে যাচ্ছেন।
এখন গোটা ব্যাপারটা এসে দাঁড়ায় আবার সেই ছাত্রসংখ্যায়। এই ছাত্রসংখ্যা কম হলে উপরিউক্ত কাজের চাপ কিছুটা হলেও সীমাবদ্ধ থাকত। এখন এই ২০০০ ছাত্রের স্কুলের ৩০ জন শিক্ষক কী অবস্থায় আছেন, পাঠকগণ নিজেই বিচার করে দেখবেন। আমাদের বিশেষ অনুরোধ রইল।
৩) এখন আসি মোবাইল নামক যন্ত্রের সমস্যায়। মজার কথা হলো, ছাত্রেরা স্কুলে মোবাইল আনতে চায়, গেম খেলতে চায়, সেলফি তুলতে চায়, আরও অনেক কিছুই চায়। তখন আমরা শিক্ষকরা তাদের তাড়া করেছি, মোবাইল আটকেছি, বুঝিয়েছি, অভিভাবক ডাকিয়ে এনেছি। এই মোবাইল অভিযানের গুরুত্বও কিন্তু অপরিসীম। অভিযান না ঠিক, এও এক ম্যাচ ক্রিকেটের মতো। “টিচার বনাম মোবাইল ছিনতাই”।
আবার নতুন সেশনে নতুন ম্যাচ শুরু হবে। আপনারা যথাসময়ে খবর পাবেন।
৪) স্কুলে সব কিছু চলছে ঠিকই, কিন্তু মাঝখান থেকে একজন শিক্ষকের বিশেষ পরিচিতি “শিক্ষকতা” শব্দটাই হারিয়ে যাচ্ছে। এত সব কাজের ফাঁকে শিক্ষা আদান-প্রদানের জন্য বরাদ্দ সময়টা কি কমে যাচ্ছে না?
আবার কনফিউজড!
একটি বিশাল বড় শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান সুপরিচালিত করার দায়িত্বভার একা যিনি চেয়ারে বসেন তাঁর নয়; প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত সকলের, সকল শিক্ষকের, সকল ছাত্রের, সকল অভিভাবকের, সকল স্থানীয় বাসিন্দার। একটি উচ্চমার্গের প্রতিষ্ঠান একদিনে নিম্নগামী হয়নি, তিলে তিলে হয়েছে। আমাদের সকলের চোখের সামনে হয়েছে।
সামাজিক, অর্থনৈতিক, আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, অনুষ্ঠানিক সকল দৃষ্টিকোণ আমাদের সজাগ করা বাঞ্ছনীয়। অনেক আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চাপ গভীরতর প্রভাব ফেলছে। যতই আমরা লিখিত আবেদন রাখি, সকল সিস্টেম শৃঙ্খলবদ্ধ করার চেষ্টা করি, বাঁধ শক্ত না হলে বাঁধ ভেঙে বন্যার জল প্রবেশ করবেই।
ঐ যে বললাম, আসছে বছর আবার হবে! তখন কিন্তু আমরা শিক্ষকদের দয়া করে দায়ী করবেন না।
স্কুলের নতুন বিল্ডিং মার্চ মাসে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল, এখন বলা হচ্ছে জুলাই মাস। বহু কষ্টে তিনটি রুম ও সেই হলঘরে ক্লাস চলছে। শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে যিনি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন, অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন। বারবার টেম্পোরারি ক্লাস রুটিন বানাচ্ছেন, ছাত্র ও ক্লাসরুম ব্যবস্থাপনায় বারবার পরিবর্তন করছেন। নতুন ছাত্রভর্তি নিয়ে বলতে গেলে একপ্রকার সংগ্রাম চলছে।
অনেকেই ছাত্রকে ভর্তি হতে না দেওয়ায় কষ্ট পাচ্ছেন। আমরা সমবেদনা ব্যক্ত করছি। কিন্তু আমাদের পরিস্থিতিও বুঝতে হবে।
এক একটা শিশু ক্রমে বড় হয়ে যুবক ও যুবতী হয়, যাদেরকে অভিভাবকরা আমাদের উপর ভরসা রেখে সারাদিনের জন্য আমাদের হাতে তুলে দেন। তাদের প্রতি আমাদেরও একটা দায়িত্ব, স্নেহ ও গুরুত্ব থেকে যায়। সর্বোপরি থাকে জ্ঞানের আয়োজন।
এই আদান-প্রদানের অনুষ্ঠানে যদি আমরা বাধাগ্রস্ত হই, আমাদের শিক্ষক হিসেবে পরিচিতির কোনো মূল্য নেই। শিক্ষা-ব্যবস্থার বিশাল আয়োজনে ফাটল ধরবে, আমাদের পথ আরও দুর্গম হবে।
তাও আমরা থেমে নেই। আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত। চলছে এবং চলতেই থাকবে। আজকের শিশুরা যদি একদিন দেশের সুন্দর ভবিষ্যৎ সৃষ্টির অংশগ্রহণকারী হয়, এটাই আমাদের মস্ত পাওনা। পরিবর্তন আসবেই, আমাদের শিক্ষার আয়োজন বিফল যাবে না।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন