মিড ডে মিল

প্রতাপ : অনলাইন-৫১

। মেঘমালা দে মহন্ত ।

ছেলেকে আজ গাছে বেঁধে পিটিয়েছে রহিমা। তাতেও রাগ পড়েনি। উঠোনের কোণে পড়ে থাকা একটা আম-পিঁপড়ের খোল ভেঙে দিয়েছে ছেলের মাথায়। মুহূর্তে লাল পিঁপড়েগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ে কামড়াতে শুরু করতেই বীভৎস চিৎকারে কেঁপে উঠেছিল চারদিক। মাথা-মুখ ফুলে উঠছিল রমজানের।রহিমার চোখে তখন আর কিছু ধরা পড়ছিল না। বুকের ভেতর শুধু আগুন জ্বলছিল।

এইটে আবার ফেল!

দুই বছর ধরে একই ক্লাসে পড়ে আছে ছেলে। অথচ এই ছেলেটাকেই এক সময় স্কুলের মাস্টাররা “হীরার টুকরা” বলত।

রমজান তখনও গাছে বাঁধা। পিঁপড়ের কামড়ে শরীর ছটফট করছে, তবু তার চোখে জল নেই। শুধু মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। সেই চোখে ভয় নেই, অভিমানও নেই—আছে একরাশ অপরাধবোধ। ছেলেটা পাঁচ মাসের পেটে থাকতেই স্বামী মারা গিয়েছিল রহিমার। তবে সেই মৃত্যুতে শোকের চেয়ে স্বস্তিই বেশি পেয়েছিল সে। ফেরিঘাটে ঠেলাগাড়ি চালাত লোকটা। কাজের চেয়ে মদ আর তাসের আড্ডাতেই সময় কাটাত বেশি। দিনের কামাই হাতে এলেই গাছতলায় ঠেলাগাড়ি রেখে বোতল নিয়ে বসে পড়ত। তারপর গভীর রাতে টলতে টলতে ঘরে ফিরে মারধর করত রহিমাকে। প্রায়ই বলত—

“গুলামরে মুরকর, পাটারে শিল, ঘাইলরে ছিয়া, বান্দিরে কিল!”

প্রথম প্রথম এসব কথার অর্থ বুঝত না রহিমা। কিন্তু কথাগুলোর ভেতরে যে অপমান আর নিষ্ঠুরতা মিশে আছে, সেটা বুঝত বেশ। ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে গেছিল রহিমা। অভ্যেস বদলেছিল যেদিন বিষাক্ত চোলাই খেয়ে বমি করতে করতে শেষ হয়ে গেল লোকটা। ওর সাথে আরও দু'জন অসুস্থ হয়েছিল, কিন্তু বেঁচে গেছে। সেদিন রাতে লোকটার লাশের পাশে বসে রহিমা কাঁদেনি। চুপচাপ পেটের ওপর হাত রেখে শুধু একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছিল মাথার ভেতর —

এই পোলাডারে মানুষ করুম ক্যামনে। ওর জীবনও কি বাপের মতন শ্যাষ পাইব!

তারপর থেকেই যুদ্ধ শুরু।

ভোরবেলা দুটো বাড়িতে ঝিয়ের কাজ শেষ করে মহাজনের চালের আড়তে কাজ করত রহিমা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বস্তা টানা, চাল ঝাড়া, ধুলো গেলা। এই হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে সংসারে দুবেলা যে ভাত জুটত মা ছেলের তাতে খিদেটা ছিল পেটের স্থায়ী বাসিন্দা। রমজান একটু বড়ো হতেই বুঝতে শিখেছিল মায়ের কষ্ট। প্রায়ই বলত—

মা, আমি পড়া ছাইড়া কামে যাই। তুমি আর আড়তে যাইও না।”

রহিমা ধমক দিত—

চুপ! পড়া ছাড়া তুর কুনো রাস্তা নাই। তুই মাস্টার হবি। চাকরি করবি। আমি না খাইয়া থাকুম, তাও তোর পড়া বন্ধ অইব না।

স্কুলের মাস্টাররাও আশা দিতেন। ক্লাস টিচার প্রায়ই বলতেন—

রমজান তোর হীরার টুকরা ছেলে রহিমা। পড়া ছাড়াইস না বুয়াই।

রহিমা হাতজোড় করে বলত—

দুয়া রাখবা ছার। আমি তারে পড়াইমু। বহুত পাশ দেওয়াইমু।

কথাগুলো বুকের ভেতর আগুনের মতো জ্বালিয়ে রাখত সে। স্বপ্ন দেখত—তার ছেলে একদিন স্কুলের মাস্টার হবে। সাদা শার্ট পরে সাইকেলে করে স্কুলে যাবে। 

কিন্তু গত দু'বছর ধরে কী যেন হয়ে গেল ছেলেটার।

পরীক্ষার হলে গেলেই যেন হাত-পা অবশ হয়ে যায়। বাড়িতে সব মুখস্থ পারে, অথচ খাতায় লিখতে বসলে মাথা ফাঁকা হয়ে যায়। কেবল কাটাকাটি আর আঁকিবুঁকি।

প্রথমবার ফেল করার পর হেডস্যার বলেছিলেন—

ছেলেটা সব জানে। কিন্তু পরীক্ষার খাতায় যেনো কুনো জিন তার হাত বান্ধিয়া রাখে!

 কথাটা রহিমার মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিল।সত্যিই কি কোনো বদ নজর? জিন-পরী?মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছ থেকে তাবিজ এনে পরিয়ে দিয়েছিল ছেলের হাতে। কিন্তু তাতেও কিছু হল না।

এবারও ফেল।

সেদিন ফল বেরোনোর পর বাড়ি ফিরতে খুব ভয় করছিল রমজানের।

পকেটে ভাঁজ করা মার্কশিট। বুকের ভেতর পাথর চাপা কষ্ট। দূর থেকে দেখেছিল মা উঠোনে বসে আছে। মুখ গম্ভীর। মুহূর্তের মধ্যে সব বুঝে গিয়েছিল রহিমা। তারপর যেন হঠাৎ পাগল হয়ে গেল।

চুলের মুঠি ধরে টেনে উঠোনে আনে ছেলেকে। গাছের সাথে বেঁধে লাঠি দিয়ে মারতে থাকে।

— ফেইল কেমনে করছস ক হারামজাদা!আমারে মারি ফালা তুই! আমি আর পারি না....  

প্রতিটা আঘাতে কাঁপছিল রমজানের শরীর।তবু সে কাঁদেনি। যখন পিঁপড়ের খোল মাথায় ভেঙে দিল রহিমা, তখন ব্যথার থেকেও বেশি অবাক হয়েছিল সে। মা এমন করতে পারে?

কিন্তু পরক্ষণেই দেখল, মারতে মারতে হাঁপিয়ে গিয়ে রহিমা নিজেই উঠোনে বসে কাঁদছে। কিছুক্ষণ পর রমজানের বাঁধন খুলে দিয়ে বারান্দার মাটিতে আঁচল বিছিয়ে শুয়ে পড়ল। অনেক্ষণ ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গেল আস্তে আস্তে।

রাত অনেক হয়েছে। আকাশে আধখানা চাঁদ উঠেছে। দূরে কোথাও শেয়াল ডাকছে। চুপচাপ বারান্দায় এসে মায়ের পাশে বসে রমজান।

 শরীর কাঁপছে। মাথা এখনও জ্বলছে। ঘুমের মধ্যেও রহিমার চোখের কোণে শুকনো জল। মুখটা কেমন ক্লান্ত। বয়স যেন হঠাৎ অনেক বেড়ে গেছে। রমজানের বুক মোচড় দিয়ে ওঠে।খুব ইচ্ছে করছিল মাকে জড়িয়ে ধরে বলে,

— পরীক্ষার সময় মাথা কাজ করে না। বড়ো খিদা লাগে মা... খুব খিদা লাগে।

কিন্তু বলতে পারে না।

কারণ সে জানে মা জানে না পরীক্ষার দিন স্কুলে মিড ডে মিল বন্ধ থাকে। অন্যদিন দুপুরে স্কুলে যে ভাত পায়, সেটাই তার সারাদিনের সবচেয়ে পেটভরা খাবার। সেদিন যেদিন স্কুল বন্ধ থাকে, সেদিন বিকেলের দিকে পেট মোচড় দিয়ে ওঠে। পড়া মুখস্থ করতে গেলেও চোখে অন্ধকার দেখে। 

ক্লাস নাইনে উঠলে মিড ডে মিল বন্ধ হয়ে যাবে।তবু আর একই ক্লাসে পড়ে থাকলে চলবে না।মায়ের স্বপ্ন, মায়ের কষ্ট, মায়ের ফাটা হাত—সব মিলিয়ে বুকের ভেতর একটা ভারী পাথর চেপে বসে। ঘুমন্ত মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রমজান মনে মনে ঠিক করে—

এইবার সে মিড ডে মিল আর ক্লাস নাইনের মধ্যে ক্লাস নাইনকেই বেছে নেবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই সপ্তাহের জনপ্রিয় পোষ্ট

আকর্ষণীয় পোষ্ট

“প্রতাপ” কেবল একটি সাহিত্যপত্রিকা নয়, বরং একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রয়াস

। মেঘমালা দে মহন্ত । প্রতাপ’-এর উনিশতম মুদ্রিত সংখ্যা শুধু একটি সাহিত্যপত্রিকার নতুন প্রকাশ নয়, বরং বরাকের সাহিত্য-সংস্কৃতি, ভাষাচেতনা এবং স...