। মৌসুমী চক্রবর্তী ।
‘বাল্যবন্ধু’ এই শব্দটি আমাদের জীবনে এক বিশেষ ভূমিকা রাখে। এই শব্দটির মধ্যে কী এক অদ্ভুত সুন্দর অনুভূতি লুকিয়ে থাকে, তা হয়তো আমরা সবসময় বুঝিয়ে দিতে পারি না, কিন্তু এক আবেগঘন ছোঁয়া আজীবন থেকে যায়। এই বন্ধুত্বের গোড়াপত্তন হয় তখন, যখন আমরা বন্ধু ও বন্ধুত্ব সম্পর্কে সব রকম জটিল তত্ত্ব সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকি।
সেই সময় আমাদের মনে না থাকে কোনো প্রকার সম্মান-অসম্মানের মাপকাঠি, না থাকে সামাজিক স্ট্যাটাস নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ, না থাকে নিজেকে সাংঘাতিক কেউকেটা হিসেবে জাহির করার অপ্রাণ চেষ্টা, বা দুষ্চেষ্টা বলতেও পারেন। এই সময়ের বন্ধুরা যেন ঠিক মেঘহীন নীল আকাশে উড়ে বেড়ানো একঝাঁক সুন্দর বলাকা।
বেলা শেষে দিন যায়, দিন শেষে বছর যায়। এভাবেই পরিবর্তনশীল জগতে বাল্যবন্ধুরা সময়ের আবর্তে ছড়িয়ে পড়ে এদিক-ওদিক। কিন্তু সেই নিতান্ত সাদামাটা ছেলেবেলার বন্ধুরা পরিণত জীবনেও কোনো না কোনো মুহূর্তে ঝলক দিয়ে যায়।
আমাদের আর্থ-সামাজিক তুলনামূলক সমীকরণের জন্য আমরা এক সমাজে একসাথে থেকেও একজন অন্যজনের থেকে মানসিকভাবে সহস্র যোজন দূরে বসবাস করি। সামাজিক অনুষ্ঠানে, কোনো সমাবেশে কিংবা রাস্তাঘাটে দেখা হলে হয়তো সৌজন্যমূলক হাসি বা আলাপচারিতায় আমরা যুক্ত হই ঠিকই, কিন্তু সেই হাসি ও গল্পগাছার আন্তরিকতা নিয়ে অনেক সময় নিজেরা নিজেদের প্রশ্ন করলে হয়তো অস্বস্তি বোধ করতে পারি।
এই আলাপচারিতায় অতিভদ্রতাবোধ মেনে চলা, প্রাসঙ্গিক ও অপ্রাসঙ্গিক কথা সম্পর্কে সতর্ক থাকা, মাপা কথা, চাপা হাসির বাধ্যবাধকতায় বন্ধু পেলেও সেই বাঁধনহারা, পাগলপারা, অমলিন বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে না। এই অমলিন বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সেই ছেলেবেলার সাথিদের সঙ্গে, যারা অপার দুরন্তপনায় শর্তহীন সঙ্গী হয়, ঝগড়া-মারামারিতে লিপ্ত হয় অহিংস মানসিকতায়। মান ভাঙাতে গিয়ে কোনো জটিল অঙ্কের সাহায্য নিতে হয় না, কিন্তু মনের টান, ভালোবাসা থাকে ঠিক গভীর সাগরের মতো, যেখানে চঞ্চলতা ও চপলতার ঢেউয়ের নিচে সুন্দর সুকোমল প্রাণের মেলা অবিরতভাবে চলতে থাকে।
আজ জীবনের প্রায় অর্ধেক সময় পেরিয়ে এসেছি। এই দীর্ঘ সময়ে নানা কাজকর্ম, অনেক চেনাশোনা, অনেক সম্পর্কের সংস্পর্শে এসেছি। অনেক বন্ধু-বান্ধব, হিতৈষী, সমালোচক, সদর্থক বা অসদর্থক, পারিবারিক সূত্রে হোক বা কার্যসূত্রে, সবাইকে নিয়ে চলেছি এবং চলব। কিন্তু সেই আবহে থেকেও যারা মনে এখনো নির্মল ভালো লাগার আবেশে উঁকি দিয়ে যায়, তারা আমার সেই আপাত ‘সাদামাটা’ বাল্যজীবনের ‘বাল্যবন্ধু’রা।
কালের নিয়মে হয়তো আমাদের কেউ আগে, কেউ পিছে এই পৃথিবীকে বিদায় জানাব। তবুও এই সম্পর্ক কখনোই মহাকালের গর্ভে বিলীন হবে না। এই চিরশাশ্বত অনুভূতি ও আবেগ এক অমর জ্যোতির প্রকাশ মাত্র। শুধু সময় ও জীব পরিবর্তনশীল।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন