মৌন সংহিতা


। শান্তশ্রী সোম ।

আপনি জানেন তো,
আমি গুনে গুনে হিসেব কষে পা ফেলি।
খুচরোর অভাবে লবণের দাম রেশন দোকানে
পঁচানব্বই পয়সার জায়গায় 
বাবা এক টাকা রেখেছিলেন বলে
কুচক্রীরা তদন্ত কমিশন বসিয়েছিল।
সাত সাতটি সন্তান নিয়েও আপসে যাননি,
উঁচু আদালতে কেস ঠুকে কপর্দকহীন বাবা
বাড়ি ফেরত এক ঝুড়ি জাটিঙ্গার কমলা নিয়ে 
ঋজু শরীরে মায়ের কাছে এসে 
একমুখ হাসি নিয়ে বলেছিলেন, 
জিতে ফিরেছি।

আর আমি! একটি ছানা ছাবাল করার ছ্যাবলামোতে
দু কানে তালা ঝুলিয়ে, দু চোখে ছানি ফেলে,
দুই ঠোঁটে কুলুপ এঁটে বসে আছি
চুপসানো বেলুনের মতো।

মৌলভীবাজারের পুরাধিয়া গ্রাম থেকে
এ পাড়ায় এসে নিঃস্ব বাবা
তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছিলেন
পূর্ত বিভাগের চাকরির প্রস্তাব।
তাঁর ভাষায় ‘সরকারের গোলামী’।
আমি গোলাম নয়, ক্রীতদাস হয়ে
রোজ সকালে পাই-পয়সার হিসেব কষে
পথ হাঁটি।
আমার নিশ্চিন্ত ঘরের দুশো মিটার দূরের
পরিযায়ী শ্রমিকের আকুতি ভরা প্রতিবাদ
আমাকে মুখর করে না।
দু হাজার বর্গমাইল দূরের
‘দীপু’র নিভিয়ে দেওয়া
প্রদীপ শিখা-ও আর আমাকে
উজ্জীবিত করতে পারে না।
স্টেরাইল স্টেরয়েড স্ট্যাটাস নিয়ে
নিশ্চিন্ত নিদ্রায় শান্তি খুঁজে নিই।

একষট্টির আন্দোলনের সকালে
ভোর ভোর রেললাইনের কাছে
পৌঁছে গিয়েছিলেন বাবা।
আগের রাতে সেরেছিলেন
পাঁঠার ঝোল দিয়ে ‘লাস্ট সাপার’।
ঘরে তখন তাঁর দু-দুটো কন্যাসন্তান
এবং নিতান্তই সরল, হাবাগোবা বউ।
আমি সেই ‘সোনার বাংলা’র সুরে
গলা মেলানোর সময় পাই না,
সেই শহিদ তীর্থক্ষেত্রকে নিয়ে হওয়া
হরেক রকমের দাবার কূটচালের
সমঝদার দর্শক আমি।
সব চালের চলনের হিসেব কষে রাখি আড়ালে, 
আমার জাবদা খাতায়,
যা গুছিয়ে রেখেছি বালিশের তলায়।

চাঁদের দেশের এক পরী
এক পূর্ণিমার রাতে
উঠোনে বসা বাবার কোলে
আমায় দিয়ে গিয়েছিল।
বাবা বললেন, ‘সোমা’।
ছোট সোমা, মানে নাগা ছাঁট চুল,
জাপানি ফ্রক, আর কাপ্পি স্কার্ট।
হরেক রকমের পূর্বোত্তর
আমার শৈশবের গর্ব, 
ভাইয়ের ডেলিশাস ড্রাইফিশ রেসিপি। 
তাই তো ভাবছি…

চাকমা আবার এঞ্জেল হয় নাকি!
চাকমা-চিন’এ ক্যামন মাখোমাখো ভাব।
বাবা দেশের সীমানা পাহারা দিচ্ছে বলে
ছেলে ‘চিনেম্যান’ হতে পারে না,
এ আবার কেমনতর কথা!
ছাড়ুন তো, ওটা ত্রিপুরার বিষয়,
আমার কথা বলতে বয়েই গেছে।
আমি উত্তর-পূর্বের বিচিত্র জনবিন্যাস নিয়ে
গর্ব করতে পারি,
লিখে ফেলতে পারি দুয়েক পিস গবেষণাপত্র।
তাই বলে ওইসব বোঁচা নাকের পোলাপানের জন্য
পা ছড়িয়ে কাঁদার সময় নেই বাপু!
এই আমি পষ্ট বলে দিলাম।

উড়ালসেতু বা এলিভেট করা সরু বারান্দার
ললিপপ হাতে নিয়ে
আমি এখন চুপটি করে
দূরে দাঁড়িয়ে দেখছি,
কার দিকে হেলবে পিসা’র টাওয়ার!
ছাপোষা বরাকীর?
না, বরাকী আদানির?

বছরজুড়ে এন্তার ভণ্ডামি শেষে
আজ আবারও দুর্গাপ্রতিমার নবীন আয়নায়
মুখ দেখব। জাল ফেলব মুখ বইয়ে।
বলব...

“আমাদের গেছে যে দিন
একেবারেই কি গেছে!
কিছুই কি নেই বাকি!”

কালের চাকার ঘরঘর থেকে ভেসে আসছে 
এক তীর্যক আওয়াজ,
ঋজু কণ্ঠে বলছে,

‘রাতের সব তারাই আছে
দিনের আলোর গভীরে…”

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই সপ্তাহের জনপ্রিয় পোষ্ট

আকর্ষণীয় পোষ্ট

প্রতাপ এর কথা

।। মঞ্জরী হীরামণি রায় ।। শৈলেন দাস বরাক উপত্যকার সাহিত্য চর্চায় এক পরিচিত নাম। শৈলেনের কবিতা আমি প্রথম ওঁর কন্ঠেই পাঠ শুনেছিলাম শনবিলে একটি...