। শৈলেন দাস ।
গত ১৯ অক্টোবর একটি স্মৃতি সতেজ করা রাত কাটিয়ে এলাম 'আশ্রম রোড গণনাট্য সংস্থা'র সঙ্গে। শিলচর শহর থেকে সামান্য দূরে খাসপুরের ঐতিহাসিক ডিমাসা রাজবাড়ির পাশে শিবরবন্দ বাগান দুর্গাপূজা কমিটির আমন্ত্রণে যাত্রানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে ছুটে যাই প্রখ্যাত যাত্রাশিল্পী প্রফুল্ল চন্দ্র সরকারের আহ্বানে। সঙ্গে ছিলেন শিক্ষক ও যাত্রাভিনেতা শিবেন্দ্র চন্দ্র দাস। যাত্রাপালায় অভিনয় করার জন্য আমি যাইনি। আমার ভূমিকা ছিল মঞ্চ ও গ্রিনরুমের মধ্যে সমন্বয় সাধনের দায়িত্ব পালন করা।
বহু বছর পর যাত্রাপালাকে উপলক্ষ করে সম্পূর্ণ বিনিদ্র একটি রজনী কাটালাম। এমনিতে রাত দশটার পর জেগে থাকা আমার পক্ষে একটু কষ্টকর, তা যতই আনন্দ বা বিনোদনের সুযোগ থাকুক না কেন। ঘড়ির কাঁটা যত এগোতে থাকে, আমার চোখেও ততই সন্তর্পণে ঘুম নেমে আসে। শরীরে ক্লান্তি বা অবসাদও বাড়তে থাকে সমান তালে। কিন্তু এবারের মহাষ্টমীর রাতে আমি যেন অন্য রকম এক উত্তেজনা অনুভব করতে থাকি।
শিলচর থেকে আমি এবং শিবেন্দ্রবাবু স্কুটিতে রওনা হই আনুমানিক বেলা ৩টা ৪৫ মিনিটে। পুরো যাত্রাদল অবশ্য যাবতীয় সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি নিয়ে এর আগেই গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা করে। শিবেন্দ্র বাবুর ধীরলয়ে চালানো স্কুটির পেছনের সিটে বসে মনের আনন্দে গান গাইতে গাইতে সূর্যাস্তের কিছুটা আগেই আমরা পৌঁছে যাই খাসপুরে। প্রথম পর্বে যাত্রাদলের অভিনেতাদের সঙ্গে কয়েকটি ছবি তুলে নিয়ে কিছুটা এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করি। পরে একটি দোকানে বসে স্থানীয় কিছু লোকজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করি এবং জানতে পারি যে পূজামণ্ডপের অনতিদূরেই ‘দেশবন্ধু নগর’ নামে আমাদের কৈবর্ত সমাজের একটি পাড়া রয়েছে।
রাত সাড়ে সাতটার পর মণ্ডপসংলগ্ন একটি ঘরে আমাদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। যাত্রাদলের পক্ষ থেকে আগেই বলা হয়েছিল, শুধু ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করলেই চলবে। সেই অনুযায়ী আয়োজকদের আন্তরিক আয়োজন উদরপূরণের পাশাপাশি মনেরও খোরাক জুগিয়েছিল ভরপুর। তারপর ধীরে ধীরে শুরু হয় সাজসজ্জার পালা। আমি যেহেতু সশরীরে উপস্থিত ছিলাম, তাই এই যাত্রাদলকে প্রচারের আলোয় নিয়ে আসার জন্য তথ্য সংগ্রহ শুরু করি। মেকআপ পর্বের একটি ভিডিওও তৈরি করে নিয়ে রিল হিসাবে ফেসবুকে পোস্ট করে দেই।
রাত দশটায় শুরু হয় ঐতিহাসিক যাত্রাপালা ‘নিহত গোলাম’। শেষ হয় রাত সাড়ে তিনটার পর। আমাকে অর্পিত দায়িত্ব পালনের ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন দৃশ্য ভিডিও এবং স্থিরচিত্র হিসাবে ক্যামেরাবন্দি করে রাখি, যাতে সেগুলি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া যায়। প্রায় পাঁচশো দর্শকের উপস্থিতিতে যাত্রাপালা শুরু হলেও শেষের দিকে দর্শকসংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকে। তবে যাত্রাপালা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও দেখলাম, কয়েকজন দর্শক প্যান্ডেলেই রয়ে গেছেন। সম্ভবত তাঁদের বাড়ি একটু দূরে হবে। আর সেখান থেকেই আসে আমার স্মৃতি সতেজ হওয়ার প্রসঙ্গ।
প্রায় আড়াই দশক আগের কথা। আমি তখন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। বাড়ি চাঁদমারি এলাকায়, কৃষ্টি বিবেক সাংস্কৃতিক সংস্থার পাশে। ইন্ডিয়া ক্লাব পয়েন্টে অবস্থিত তারাপুর মসজিদ-সংলগ্ন উকিল বাজার মক্তবের ছাত্র আমি। পুজোর ছুটি শেষ হওয়ার কিছুদিন পরে নিউ কলোনির বাসিন্দা আমার সহপাঠী দিলীপ দাস জানাল যে আনন্দ পরিষদে যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হবে। ওরা সবাই তা দেখতে আসবে। আমিও যাত্রাপালা দেখতে আগ্রহ প্রকাশ করি। কিন্তু যাত্রা শেষ হওয়ার পর আমি একাকী বাড়ি যাব কী করে? কারণ, চাঁদমারি এলাকার কেউ তো আর যাত্রা দেখতে আসবে না!
তখন দিলীপ আমাকে জানাল যে যাত্রা শেষ হতে হতে প্রায় ভোর হয়ে যায়। সেই সময় অনেক লোক ফুল তুলতে বের হয়। তাই ওরা বাড়ি ফেরার পথে আমাকে আমার বাড়ির দিকে এগিয়ে দিয়ে যাবে। তার সেই প্রস্তাবে আমি রাজি হয়ে যাই। মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে খাওয়াদাওয়া সেরে রাত সাড়ে নয়টার মধ্যে আনন্দ পরিষদের যাত্রামঞ্চের কাছে চলে যাই।
এখানে বলে রাখা ভালো যে আমাদের শৈশব-কৈশোর এমনভাবেই কেটেছে যে আমরা যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গায় একাই যেতাম এবং সব পরিস্থিতিতে নিজেদের মানিয়ে নিতাম, তা সে রাত হোক বা দিন। এখন যদিও এসব life skills বা জীবনদক্ষতা বলে নতুন করে শিখছি বিএড এর ছাত্র হিসেবে।
যাই হোক, যাত্রার আসরে দিলীপ ও তার বন্ধুদের সঙ্গে মিলে ভরপুর আনন্দ উপভোগ করছিলাম। কিন্তু কোনো এক কারণে সেদিনের যাত্রানুষ্ঠান রাত আড়াইটার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। তখন সব দর্শক যে যার বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন এবং অনেকে নিজেদের বাড়িতে পৌঁছেও যান। শুধু আমি আর দিলীপ যাত্রামণ্ডপের সামনে রয়ে যাই।
হঠাৎ দিলীপের বাবা রাগান্বিত হয়ে এসে আমার কথা না ভেবেই দিলীপকে মারতে মারতে বাড়িতে নিয়ে যান। আমি তখন কী করব, ভেবে না পেয়ে যাত্রামঞ্চের পাশে, যেখানে বসে বাদ্যযন্ত্র বাজানো হতো, সেখানে একটি মাদুরে শুয়ে পড়ি। আমার ধারণা ছিল, যাত্রাদলের লোকজন যন্ত্রপাতি খুলতে খুলতে রাত শেষ হয়ে আসবে এবং আমি নিরাপদে বাড়ি ফিরে যেতে পারব।
কিন্তু অল্প কিছুক্ষণ পরেই আমি টের পাই, কেউ একজন আমাকে ডাকছেন। চোখ খুলে যাঁকে দেখতে পাই, তাঁকে আমি চিনি, কারণ তিনি আমাদের স্কুল পরিচালন সমিতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কিন্তু তিনি সম্ভবত আমাকে চিনতেন না। তবুও আমাকে একা দেখে তিনি তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেলেন।
রাত তখন তিনটে। তাঁর বৌদি তাঁর জন্য ভাত বেড়ে রেখে দিয়েছিলেন। আমরা দুজন মিলে সেই ভাত ইলিশ মাছের ঝোল দিয়ে খাই। তারপর তিনি তাঁর বিছানায় তাঁর পাশে আমার শোয়ার ব্যবস্থা করে দেন। আমি বেশ নিরাপদ ও আরামবোধ করছিলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই ঘটল বিপত্তি। সেই বৃত্তান্ত অন্য একদিন লিখব...
যাত্রানুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর ভোর চারটার সময় আমি ও শিবেন্দ্রবাবু বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিই। এবার স্কুটি চালানোর পালা আমার। আবার সেই আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে, কুমার শানুর গান গাইতে গাইতে বাড়ির পথে এগিয়ে চলি। শেষ পর্যন্ত সকাল পাঁচটা কুড়ি মিনিটে বাড়িতে পৌঁছে যাই।
@highlight #Jatrapala #jatraupdate

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন