শবরীর প্রতীক্ষা

প্রতাপ : অনলাইন-৫৬

। মঞ্জরী হীরামণি রায় ।

আকাঙ্ক্ষা ছিল দীর্ঘদিনের। অবশেষে সে এলো। ন'মাসের অপেক্ষার সময়টাতে তাকে অনুভব করেছে মোহনা আর অর্ক। ভালোবাসার স্পন্দনে সে বারবার জানান দিয়েছে—আমি আসছি। একদিন রৌদ্রস্নাত বসন্তের সকালে অনেক প্রত্যাশা নিয়ে মোহনা আর অর্কের ভালোবাসার কাহন চোখে আলো মেখে সবার জন্য এক ঝুড়ি খুশি নিয়ে হাজির হলো। চারদিকে তখন বসন্তের কুহুতানে এক জোড়া প্রেমীর অনুরাগে সিক্ত রাগিনী সাহানার মীড়।

খুশিতে আত্মীয়পরিজন সবার তখন নোঙর বইছে জোয়ারে। কিন্তু মোহনা খেয়াল করে, ছোট্ট প্রাণটা যেন কিসের জন্য ছটফট করে। দিনটা যা হোক, রাত নামলে সে যেন কার অপেক্ষায় অধীর হয়ে ওঠে। যেন রাত পোহালেই সে আসবে। ভোরের আলো ফুটলে ভেন্টিলেটরের ফাঁকে সে চোখ রাখে। একটুকুন সুনীল আকাশের টুকরোতে সে যেন কার সাথে কথা বলে সুর তুলে। তার সে সুরে লৌকিক ভাষা না থাকলে কী হবে, মোহনা ঠিক বুঝতে পারত, কারও সাথে বাতচিত চলছে। কিন্তু কে সে!

বসন্তের শেষে এক গোধূলিতে দারুণ চৈত্রঝড় উঠলে। সন্ধ্যে নামার আগেই চারদিকে আঁধার ঘনিয়ে এলো। অর্ক তখনও অফিস থেকে ফেরেনি। মোহনার চিন্তা হচ্ছিল। এই ঝড়জলে না জানি সে কোথায় আটকা পড়েছে। ওদিকে সাহানার কিন্তু একটুও কান্নাকাটি নেই। সেই এক টুকরো ভেন্টিলেটরে সে আকাশে বিদ্যুতের চমক দেখছে। যেন কোনো খুশির বার্তা পেয়েছে। মোহনা অবাক হয়ে দেখে।

ঝড়ের পর বৃষ্টি নামলে অর্ক ফিরল কাকভেজা হয়ে। বাবাকে দেখে তার সে কী হাসি! সেদিনই সে প্রথম হাসতে শিখল। অর্ক বলল—বাবার দুর্দশাতেই তোর হাসি পেলো, দুষ্টু!

অর্ক জামাকাপড় ছেড়ে টিফিন খেয়ে প্রতিদিনের মতো সাহানাকে কোলে নিয়ে বসলো। তাকে গল্পে গল্পে বলতে লাগল কী করে ঝড় এলো। বৃষ্টি নামল। বিহগদের নীড়ে ফেরার সংগ্রামের কথাও বলল। গাছেদের প্রবল লড়াইয়ের গল্পও শুনল সে বাবার কাছে। সে কী আনন্দ তার! কত সুর, কত গান, কত হাসি। অদ্ভুত তার অভিব্যক্তি। অর্ক বলল—বুঝেছি, মায়ের মতো তুমিও বর্ষা ভালোবাসো। কিন্তু সোনামণি, বর্ষায় যখন পথঘাট জলে থৈ থৈ হবে, তখন কী হবে? সাহানা ঠোঁটের কোণে হাসি তুলে। মোহনা পাকশালে রাতের খাবার তৈরি করছিল। বাপ-মেয়ের সব কথাই তার কানে যাচ্ছিল। এবার সে-ও যোগ দিল সেই কথালাপে—একটু বড় হয়ে যাও মামণি। আমরা বৃষ্টিতে ভিজব একসাথে। তিনটি প্রাণের অনুরাগী আলাপন আর বাইরে বৃষ্টির নিক্কণ মিলে সেই মহেন্দ্রক্ষণে চারদিকে বেজে ওঠে সাহানার অনুরাগী মীড়।

একটি একটি করে দিন যায়। সাহানা বাড়ে তিল তিল করে। আজকাল তার আকাশের সাথে কথা বলা অনেক বেড়েছে। তার আকাশ-প্রীতি দেখে অর্ক আর মোহনা মাঝে মাঝে তাকে উঠোনে নিয়ে যায়। সাহানা খিলখিল করে হাসে। এরই মধ্যে মোহনার মা মল্লিকা এলেন সাহানার সাথে থাকবেন বলে। শুধু থাকবেনই না। ফেরার সময় ওদের সাথে করে নিয়েও যাবেন। মল্লিকা আসার সময় মোহনার পছন্দের এক ঝুড়ি অমলতাস, জারুল আর সোনালু ফুল নিয়ে এসেছেন। মোহনার জন্ম শরতে। মেয়ের জন্মের পরই শশী বাবু মানে মোহনার বাবা চারটে গাছ সারি বেঁধে রোপণ করেছিলেন। বেগুনি জারুল, হলুদ গোলমোহর, লাল কৃষ্ণচূড়া আর গোলাপি রাধাচূড়া। শশী বাবুর পরিচর্যায় সে বছরই বর্ষায় গাছগুলো ফুল দিয়েছিল। ব্যতিক্রম ছিল কৃষ্ণচূড়া। মোহনা এই গাছগুলোর সাথেই বেড়ে উঠেছে। ওদের জন্য তাই তার অনুভূতি ছোটবেলার বন্ধুর মতোই। বিয়ের পর মোহনা ও বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে বটে, কিন্তু ওই গাছগুলোকে ও ভীষণ ভীষণ মিস করে। তবে প্রতি বর্ষায় ঝুড়ি ভর্তি ফুল একবার হলেও ওর জন্য আসবে। আর প্রতি বর্ষায় সে গ্রামের বাড়িতে কয়েক দিনের জন্য হলেও শৈশবের সেই বন্ধুদের সাথে কাটিয়ে আসবে। প্রতিবারই কৃষ্ণচূড়া গাছে ফুল আসার অপেক্ষা করবে। তবে আজ অবধি গাছটিতে ফুল আসেনি। শশীবাবু প্রথমদিকে অনেক চেষ্টা করেছেন ফুল ফোটানোর। বিশেষজ্ঞদের ডেকে এনেছেন। তারাও চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কৃষ্ণচূড়ার কোনো হেলদোল নেই। গ্রীষ্মের মাঝামাঝি থেকেই সবক'টি গাছ ফুল দিতে শুরু করত, শুধু কৃষ্ণচূড়া তার চিড়ল চিড়ল পাতার সবুজ আভার মায়াতেই বেঁধে রাখত নিজেকে। শশীবাবু একসময় হাল ছেড়ে দেন। অনেকেই পরামর্শ দিয়েছিল গাছটি কেটে ওখানে নতুন গাছ রোপণ করার জন্য। কিন্তু মল্লিকা আর শশীবাবু সেসবেই কান দেননি। ফুল আসছে না বলে একটা গাছকে কেটে ফেলতে হবে! কেন বাপু, ও তো কোনো অনিষ্ট করছে না। তার সবুজ আভায় মায়া ছড়াতে তো কম ছড়াচ্ছে না। মানুষ তবুও প্রতি বছরই জ্ঞান দেয়। গাছটিকে বাঁজা-ও বলে। মল্লিকা-শশী ওসবের আমল দেন না। শশী বাবু বিশ্বাস করতেন, এ গাছ শবরীর মতো কারও প্রতীক্ষায় রয়েছে। যেদিন তার প্রার্থিতের দেখা পাবে, সেদিন ঠিক নিজেকে কুসুমিত করে তুলবে, ফুলে ফুলে রাঙিয়ে দেবে ছোট্ট আঙিনা, পথ।

ঝুড়ি হাতে নিয়ে মোহনা ফুলগুলোকে দেখে। প্রাণ ভরে গন্ধ নেয়। আর হাসতে হাসতে বলে—আমাদের শবরী এ বছরও প্রতীক্ষায় রইল। তার কথায় মল্লিকা আর অর্কও হেসে ওঠেন। না জানি কেন সাহানা ভীষণ জোরে কেঁদে ওঠে। সবাই তখন ব্যস্ত হয়ে পড়ে তাকে নিয়ে।

সাহানা আজ দিদার সাথে গাঁয়ের বাড়িতে যাবে। মোহনা যাবে। অর্কও যাবে। দুদিনের ছুটি আর উইকএন্ড মিলিয়ে চার দিনের ছুটি ম্যানেজ হয়েছে অর্কের। সবাই তৈরি। অপেক্ষা অর্কের বাড়ি ফেরার। দুয়ারে গাড়ি প্রস্তুত হয়েই আছে।

গাঁয়ের বাড়িতে পৌঁছুতে পৌঁছুতে রাত হলো। মোহনা, অর্ক, মল্লিকা সবাই ভাবছিল সাহানাকে নিয়ে। নতুন জায়গা। মানিয়ে নিতে পারবে তো!

সবার আশঙ্কাকে মিথ্যে করে দিল সাহানা। ও যেন ভীষণ খুশি। মায়ের দুধ খেয়ে ঘুমিয়ে গেল। মোহনা খেয়াল করল, ওর মুখটা আজ যেন অন্য রকম। সেই যে অধীর হয়ে থাকা, মাঝে মাঝেই চঞ্চল হয়ে ওঠা, সে ব্যাপারটা আজ নেই। এক অলৌকিক দ্যুতি যেন চেহারায়। মল্লিকা, অর্ক সবাই দেখল সেই অপূর্ব দৃশ্য। মল্লিকার দু'চোখ বেয়ে জল নামে। শশী বাবুর স্মৃতিতে আজ সবাই ভীষণ কাতর হয়ে পড়ে।

ভোরের স্বর্গীয় মায়ায় চরাচর উদ্ভাসিত হওয়ার মুহূর্তরা বোধহয় প্রকৃতির অনন্য সৌন্দর্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। আর সেই অতিলৌকিক সময়টাতে যদি বেজে ওঠে ভৈরবীর বদলে সাহানার মীড়! হ্যাঁ, তাই হলো। এই ব্রাহ্মমুহূর্তে মোহনা-অর্কের অনুরাগসিঞ্চিত কাহনের ভাষাহীন কথালাপে এমনই সুর বেজে উঠল। আলো ফোঁটার আগে চোখ মেলার অভ্যাস মল্লিকার চিরকালের। আজও এর ব্যতিক্রম হলো না। সদর দরজা খুলে তিনি যখন অঙ্গনে পা রাখেন, তখন সবে মাত্র পূবাকাশে রবি উঁকি দিয়েছে। সেই আবছা আলোয় তিনি দেখলেন এক অলৌকিক দৃশ্য। উঠোনের সবুজ ঘাসে অমলতাস, জারুল, সোনালুর সাথে অপূর্ব দৃশ্য রচনা করতে ছড়িয়ে রয়েছে রক্তিম কৃষ্ণচূড়া। তিনি চোখ তুলে উপরে তাকিয়ে দেখেন, গাছ ভর্তি থোকা থোকা রক্তিম কৃষ্ণচূড়া। তিনি আবেগ ধরে রাখতে পারেন না।

জোরে ডাকেন—মোহনাআআআআ...

মোহনা, অর্ক বেরিয়ে আসে বাইরে। মল্লিকা সাহানাকে কোলে তুলে নেন। সাহানার কপালে চুমু দিয়ে বলেন—তুই এলি, তাই এতদিনে শবরীর প্রতীক্ষা ফুরালো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই সপ্তাহের জনপ্রিয় পোষ্ট

আকর্ষণীয় পোষ্ট

প্রতাপ এর কথা

।। মঞ্জরী হীরামণি রায় ।। শৈলেন দাস বরাক উপত্যকার সাহিত্য চর্চায় এক পরিচিত নাম। শৈলেনের কবিতা আমি প্রথম ওঁর কন্ঠেই পাঠ শুনেছিলাম শনবিলে একটি...