প্রতিফলন

প্রতাপ : অনলাইন-৬০

। নবনীতা দে ।

দামিনী ম্যানেজমেন্ট বিভাগের স্টুডেন্ট। ভালোবাসে এক স্বাধীন জীবন। বড় হয়েছে মা-বাবার সঙ্গে বেশ বিলাসিতার মধ্যে। পড়াশোনায় মনোযোগী, নাচ, গান ও বিভিন্ন বিভাগে পারদর্শী। বেছে নিয়েছে তার মনমতো বিষয় অর্থনীতি। সুনামের সঙ্গে কৃতিত্ব অর্জন করেছে। এর পর ম্যানেজমেন্ট। ভালো চাকরি পাবে, ভালো উপার্জন হবে, দেশের বাইরে বেড়াতে যাবে মা-বাবার সাথে, এই সকল গল্পের মাঝে মাঝে সকলে মিলে ভালো সময় পার হয়। আবার কোনো সময় বন্ধুদের গল্পও হয়। কোথায়, কখন, কাদের সাথে আড্ডা হচ্ছে, সব কথাই যেন মায়ের সঙ্গে চলে।

আজকাল দামিনী প্রায়ই মাকে বলে যে সে হোস্টেলে থাকবে। মা জিজ্ঞেস করলে বলে বন্ধুদের সাথে পার্টি আছে। কিছু টাকাও মায়ের থেকে নিয়ে যায়। পরের দিন ক্লাস শেষ করে বাড়ি ফেরে। এভাবেই আনন্দের সাথে দিন কেটে যাচ্ছে। মা-বাবার একমাত্র মেয়ে দামিনী। সাথে আছে দুজন খুব ভালো বান্ধবী, কাজল ও ওমি। দুজনেই ছোটবেলার বান্ধবী। একসাথে ছোটাছুটি করে বড় হয়েছে। একই স্কুলপড়ুয়া। আজকাল তাদের সাথে যোগাযোগ একটু কম। কেননা ওরা ম্যানেজমেন্ট নয়, কাজল বিবাহিত এবং ওমি একটি স্কুলে শিক্ষিকা। মাঝে মাঝে দেখা-সাক্ষাৎ ছাড়া আর বেশি কিছু নয়। তাই দামিনী যেন একটু আলাদা হয়ে গেল। মাঝে মাঝে একা একা নদীর ধারে বেড়াতে চলে যায়, কখনও বা পার্কে সময় কাটায়। সাথে থাকে আসিফ, এক শিক্ষিত যুবক। কিন্তু পরিবার চালানোর তাগিদে আজ তাকে অটো চালাতে হয়। বাড়িতে আছে আসিফের মা। দেখতে দেখতে দামিনী ও আসিফের মধ্যে বেশ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। দামিনী আসিফের বাড়িতেও মাঝে মাঝে যাতায়াত করে। এ ব্যাপারে আসিফের মা আসিফের সাথে ধর্ম ও সংস্কৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। কিন্তু আসিফ ও দামিনী যে প্রাপ্তবয়স্ক। তাদের চিন্তাধারা এ ব্যাপারে কিছুটা আলাদা। ওরা যেন ডানা মেলা পাখি। যেখানে ইচ্ছা উড়ে চলে। বাঁধনবিহীন জীবন।

আজ সকাল হতেই দামিনী মাকে বলে যে আজ কলেজে গেট-টুগেদার আছে। তাই বাড়ি ফেরা হবে না, কেননা রাতে অনেক দেরি হবে, কমিউনিকেশন ভালো না। মা বুঝতে পারলেন, ফিরতে অসুবিধা হবে। তাই ওকে কিছু টাকা দিলেন এবং কোনো অসুবিধা হলে ফোন করতে বললেন। দামিনী চলে গেল। কলেজে গেট-টুগেদারের পর রাতে আসিফের ফোন এলো। দামিনী ও আসিফ একসাথে বেরিয়ে গেল। আজ রাতে ওরা একটি হোমস্টেতে থাকবে। এটা ওদের পরিচিত জায়গা।

বেশ কিছুক্ষণ পর, প্রায় মধ্যরাতে মায়ের কাছে ফোন এলো। ফোনে কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠলেন মা। দামিনী কাঁদছে আর বলছে, 'আমাকে ওরা মেরে ফেলবে, আমাকে বাঁচাও।' তৎক্ষণাৎ ফোন কেটে গেল। কণ্ঠস্বর বন্ধ হয়ে গেল। বাবা-মা দুজনেই কিছুক্ষণের জন্য নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। এ কী হলো? ও কোথায়? ওরা কারা? কেন কাঁদছে? কলেজে কী এমন হলো? অন্য ছাত্রছাত্রীরা কোথায়? কত প্রশ্ন দুজনের মনে যেন ঝড় তুলছে। সমুদ্রের বিশাল ঢেউ যেন বিকট শব্দ করে কিছু ইশারা করছে। সব কিছু ভেসে গেল, সব শেষ হয়ে গেল। চিৎকার করে উঠলেন মা। বাবাকে বললেন, 'নিয়ে চলো আমায়, এখুনি নিয়ে চলো। সব শেষ হয়ে গেল যে।'

হতাশ হয়ে পড়লেন বাবা শেখর বসু। এত রাতে কোথায়, কী করে মেয়ের সাথে যোগাযোগ করবেন? কাকে কী বলবেন, কিছুই বুঝে উঠতে পারলেন না। আর মা শুধু কলেজের বান্ধবীদের ফোন করতে লাগলেন, কিন্তু কিছু জানতে পারলেন না। সবাই শুধু শুনে আশ্চর্য হলো যে এ কী হলো! এভাবেই সময় পার হতে লাগলো। অবশেষে শেখরবাবু থানায় যোগাযোগ করলেন। সেখানে ফোন থেকে নির্দিষ্ট স্থানের ভৌগোলিক অবস্থান জেনে পুলিশ সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হলেন এক নির্জন এলাকায় অবস্থিত সেই হোমস্টেতে।

AI-তে আজকাল আমরা অনেকটাই এগিয়ে। পুলিশের সাহায্যে বিশেষ কষ্ট হলো না দামিনীকে পেতে। দোতলায় একটি খোলা ঘরে টাইলসের ওপর শুয়েছিল দামিনী। কিন্তু এই দেহে নেই প্রাণ, নেই তার কোনো কথা, নেই কোনো সতেজ ভাব। বাবা হয়ে চোখের জল আটকাতে পারলেন না। অতিসত্বর দামিনীকে নিয়ে এলেন তাঁর মায়ের কাছে। সেই সময় ভোর হয়েছে, সূর্যের আলোয় যেন দামিনীর মুখের মলিনতা এইটুকুও ক্ষীণ হলো না। এখনও যেন তাকে মা, মা বলে ডাকছে, বোঝাতে চাইছে তার অন্তরের যন্ত্রণা। তাকে দেখে স্তম্ভিত হয়ে রইলেন মা। কোনো কথা বলতে পারছেন না। সময় যেন এখানেই থেমে গেল।

পরে রইল দামিনীর নিথর দেহ। পাশে কিছু মানুষ এবং মা, দময়ন্তী বসু। চোখের জলের সঙ্গে একটু একটু আলতো আলতো কিছু কথা, যা পরিচয় করিয়ে দেয় দামিনীকে উপস্থিত জনগণের কাছে। বলছেন, কেন হলো এমন, কী যে হলো। সত্যি তো, কেন এমন হলো! কোথায় ভুল হলো? কোন ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ও শাসন জল ও তেলের মিশ্রণের ন্যায় মিশতে পারছিল না! এভাবেই কি আজ হাসিখুশি জীবনগুলো ধারা পরিবর্তিত হয়ে অবশেষে নিশ্চুপ হয়ে যায়?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই সপ্তাহের জনপ্রিয় পোষ্ট

আকর্ষণীয় পোষ্ট

‘শুধু গল্প নয়’ : আসলেই শুধু গল্প নয়

। কাত্যায়নী দত্ত চৌধুরী । গল্পের মধ্যে নিহিত থাকে আমাদের সাদামাটা জীবনশৈলী, আমাদের অন্তরের অন্তর্নিহিত কথোপকথন, এক মুক্ত আকাশ, চিন্তা ও ভাব...